চলো হারিয়ে যাইঃ অপরাজিতা
কবিদের
কোন শিক্ষক নেই। কবিরা পড়তে পড়তে লিখতে লিখতে শেখে। প্রকৃতি কবিদের সবচেয়ে বড়
শিক্ষক। প্রকৃতি ও পরিবেশ থেকে কবিরা শিক্ষা নিয়ে চেতনাবোধের জগতকে আলোকিত করে।
তাই একজন কবি কতটুকু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত তার উপর নির্ভর করে না তাঁর
কবিত্ব শক্তি ও কবিতার নির্মাণ। তাই একজন কবির চেতনে কিংবা অবচেতনে তাঁর কবিতা
হয়ে ওঠে ব্যাকরণ শুদ্ধ ও সমৃদ্ধ।
কবি
অপরাজিতা তাঁর 'চলো হারিয়ে যাই' কবিতাটি মূলত
প্রেমকে উপজীব্য করে লিখেছেন। কিন্তু সেই প্রেমের গতায়ন কখনো ব্যক্তিগত, কখনো সামগ্রিক। এক জীবনের প্রেমকে তিনি অতীত, বর্তমান
ও ভবিষ্যতের মধ্য দিয়ে অনুভব করেছেন। সহজ সরল সাবলীল ভাষায় প্রাণবন্ত এই কবিতা।
একটি
কবিতা তখনই সার্থক হয়ে ওঠে যখন সেই কবিতায় পাঠক নিজেরই স্বচ্ছ আদল আবিষ্কার
করেন। কবিতার বাঙময় শব্দেরা তার একান্ত একার মনে হয়। তার অনুভূতির সাথে মিলে যায়
কবিতার যাবতীয় পাওয়া, না পাওয়া, প্রেম, বিরহ, মিলন, হাসি, কান্নার একান্ত অনুভব। কবিতাটি পড়ে আমারও মনে হয়েছে- এ যেন আমারই লেখা
কবিতা। আর দীপালী ঘোষ যেন আমারই প্রেমিকা। প্রত্যেক পুরুষেরই একজন দীপালি ঘোষ থাকে
এবং প্রত্যেক নারীই যেন এক একজন দীপালি ঘোষের প্রতীক। নিরবে নিভৃতে সয়ে যায়
জাগতিক যন্ত্রণা। এই কবিতায় কবি নিজেই দীপালি ঘোষের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
চলো
হারিয়ে যাই দুজনে
স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে
ধানসিড়ি নদীটির তীরে।
স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে
ধানসিড়ি নদীটির তীরে।
কবি
তাঁর প্রিয়জনের সাথে হারিয়ে যেতে চেয়েছেন স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে ধানসিড়ি
নদীটির তীরে। কবিতার এই অংশে 'আবার আসিব ফিরে'র
জীবনানন্দের কথা মনে পড়ে যায়। তিনি মৃত্যুর পর ধানসিড়ি নদীটির তীরে ফিরে আসতে
চেয়েছিলেন মাতৃভূমিকে ভালোবেসে। কবি অপরাজিতা এই জীবনে তাঁর প্রিয়তমর সাথে
হারিয়ে যেতে চান ধানসিড়ি নদীটির তীরে। তাঁর প্রেমার্ত হৃদয় ভালোবাসার টানে
বারবার নদী ও প্রকৃতির কাছে ফিরে যায়। একদিন সবাইকেই ফিরে আসতে হয় ভালোবাসার
টানে।
চলো
ফিরে যাই
আমাদের সেই চেনা পৃথিবীতে ;
যেখানে আছে সবুজ ধানক্ষেত
আর গোধূলির আলো খেলা
আছে সেই অশ্বত্থ গাছটা
যার তলে রোজ বিকেলে
তুমি এসে দাড়াতে।
যে আজো দাড়িয়ে আছে
তোমার আমার
ভালবাসার সাক্ষী হয়ে।
আমাদের সেই চেনা পৃথিবীতে ;
যেখানে আছে সবুজ ধানক্ষেত
আর গোধূলির আলো খেলা
আছে সেই অশ্বত্থ গাছটা
যার তলে রোজ বিকেলে
তুমি এসে দাড়াতে।
যে আজো দাড়িয়ে আছে
তোমার আমার
ভালবাসার সাক্ষী হয়ে।
এই
পৃথিবী জাতিস্মরের পৃথিবী নয়, এই পৃথিবী ভালোবাসার পৃথিবী। কবি এখন
জীবনের অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে স্মৃতিকাতর হয়ে আবার সেই পুরনো জীবনের পরিচিত পথে
ফিরে যেতে চান। যে পৃথিবী ভালোবাসায় গড়া, যেখানে আছে সবুজ
ধানক্ষেত ও গোধূলির আলো খেলা। যেখানে তাঁর ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক
অশ্বত্থ গাছ, যেখানে রোজ বিকেলে কবির প্রিয়তম এসে দাঁড়াতো।
সেই অশ্বত্থ বিকেলের ভালোবাসাবাসি মনে পড়ে কবির, তাই তিনি
তাঁর ভালোবাসার মানুষের সাথে আবারও ফিরে যেতে চান ভালোবাসার স্মৃতি বিজড়িত চেনা
পৃথিবীতে।
চলো
ফিরে যাই,
দুজনে
অনন্ত পথের রেখা ধরে।
যাবে কি গো তুমি?
ভেবে নিয়েছ বুঝি?
দীপালী ঘোষেরা শুধু
দুঃখই দিতে জানে!
না গো,ওরা যে দগ্ধও হতে জানে।
সারাটি জীবন ধরে
অনুতাপের তীব্র দহনে।
সে দহন যায় না গো দেখা
না যায় দেখানো ;
অনির্বাণ চিতায়
জ্বলে যাওয়া নিরন্তর।
এই জীবনে কভু
হবে নাকি
সেই শাপমোচন?
অনন্ত পথের রেখা ধরে।
যাবে কি গো তুমি?
ভেবে নিয়েছ বুঝি?
দীপালী ঘোষেরা শুধু
দুঃখই দিতে জানে!
না গো,ওরা যে দগ্ধও হতে জানে।
সারাটি জীবন ধরে
অনুতাপের তীব্র দহনে।
সে দহন যায় না গো দেখা
না যায় দেখানো ;
অনির্বাণ চিতায়
জ্বলে যাওয়া নিরন্তর।
এই জীবনে কভু
হবে নাকি
সেই শাপমোচন?
কবি
অনন্ত পথের রেখা ধরে ফিরে যেতে চান ফেলে আসা সময়ের কোন এক ক্ষণে যখন তাঁর
ভালোবাসা ছিল, ছিল ভালোবাসার মানুষও। আজ তাঁর পাশে নেই ভালোবাসার
মানুষ। হয়তো দুঃখ পেয়ে চলে গেছে তাঁর প্রেমিক পুরুষ। যেমন, দুঃখ পেয়ে চলে যায় প্রেমিকেরা। তাই কবি তাঁর প্রেমিককে আহ্বান করছেন,
'যাবে কিগো তুমি?' আবার নিজেই স্বগতোক্তি করে
বলছেন, 'ভেবে নিয়েছো বুঝি?/ দীপালী
ঘোষেরা শুধু/ দুঃখই দিতে জানে!/ না গো,ওরা যে দগ্ধও হতে
জানে/ সারাটি জীবন ধরে/ অনুশোচনার তীব্র দহনে।/ সে দহন যায় না গো দেখা/ না যায়
দেখানো ;/ অনির্বাণ চিতায়
/জ্বলে যাওয়া নিরন্তর।'
/জ্বলে যাওয়া নিরন্তর।'
একদিন
কবি তাঁর প্রিয়তমকে আঘাত দিয়েছিলেন তাই তিনি অনুশোচনার তীব্র দহনে নিরন্তর
জ্বলেছেন অনির্বাণ চিতায়। তিনি আজ ভুল বুঝতে পেরেছেন, তাই
হৃদয়ের আকুতি তাঁর এই বেদনাবিধুর জীবনের অভিশাপ কী হবে মোচন? তিনি কী ফিরে পাবেন ভালোবাসা? তাঁর ভালোবাসার মানুষ
কী তাকে ক্ষমা করবে? হয়তো একজন খোঁজ রাখে না আর একজন মানুষ
তার ভালোবাসায় কতটা পোড়ে নিরবে নিভৃতে, কেউ রাখে না তার
খবর। আমরা যে যার নিজের জ্বালায় জ্বলছি। কেউ ভালোবাসা না পেয়ে, কেউ ভালোবাসাকে ফিরিয়ে দিয়ে। তবু ভালোবাসা ফিরে পাওয়ার আতীব্র কামনা
মানুষের আজীবন থেকেই যায়। কেউ পায়, কেউ পায় না অথবা কেউ
পেয়েও হারায়।
কবিতায়
ব্যবহৃত 'কভু' শব্দটি আধুনিক বাংলা কবিতায় অপ্রচলিত। 'কভু' শব্দের পরিবর্তে কখনো ব্যবহার করা ভালো। কিছু
শব্দ বর্তমানে অপ্রচলিত, অর্থাৎ শব্দটি সঠিক কিন্তু তার পরিবর্তিত
রূপ ব্যবহৃত হয়। যেমন, কভু, মোর,
তব, মম...ইত্যাদি।
কবি
অপরাজিতার 'চলো হারিয়ে যাই' কবিতাটি
প্রত্যেক হৃদয়বান এবং হৃদয়বতীদের মন ছুঁয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। কবিতার কোন
ধ্রুব সংজ্ঞা এখনও নিরুপিত হয়নি। তাই কোন লেখাটা কবিতা হয়েছে এবং কোনটা হয়নি
সেটা কেউ জোর দিয়ে বলতে পারে না। আমার মতে এই কবিতাটি নিঃসন্দেহে হৃদয়স্পর্শী
সুখপাঠ্য একটি কবিতা এবং পাঠকের মনে নিঃসন্দেহে ঠাঁই করে নেবে বলে মনে করি।
কবিতাটি উদ্ধৃত করছিঃ
চলো
হারিয়ে যাই
চলো
হারিয়ে যাই দুজনে
স্বপ্নিল সিড়ি বেয়ে
ধানসিঁড়ি নদীটির তীরে।
চলো ফিরে যাই
আমাদের সেই চেনা পৃথিবীতে ;
যেখানে আছে সবুজ ধানখেত
আর গোধুলীর আলো খেলা
আছে সেই অশ্বত্থ গাছটা
যার তলে রোজ বিকেলে
তুমি এসে দাড়াতে।
যে আজো দাড়িয়ে আছে
তোমার আমার
ভালবাসার সাক্ষী হয়ে।
চলো ফিরে যাই, দুজনে
অনন্ত পথের রেখা ধরে।
যাবে কি গো তুমি?
ভেবে নিয়েছ বুঝি?
দীপালী ঘোষেরা শুধু
দুঃখই দিতে জানে!
না গো,ওরা যে দগ্ধও হতে জানে।
সারাটি জীবন ধরে
অনুতাপের তীব্র দহনে।
সে দহন যায় না গো দেখা
না যায় দেখানো ;
অনির্বাণ চিতায়
জ্বলে যাওয়ানিরন্তর।
এই জীবনে কভু
হবে নাকি
সেই শাপমোচন?
স্বপ্নিল সিড়ি বেয়ে
ধানসিঁড়ি নদীটির তীরে।
চলো ফিরে যাই
আমাদের সেই চেনা পৃথিবীতে ;
যেখানে আছে সবুজ ধানখেত
আর গোধুলীর আলো খেলা
আছে সেই অশ্বত্থ গাছটা
যার তলে রোজ বিকেলে
তুমি এসে দাড়াতে।
যে আজো দাড়িয়ে আছে
তোমার আমার
ভালবাসার সাক্ষী হয়ে।
চলো ফিরে যাই, দুজনে
অনন্ত পথের রেখা ধরে।
যাবে কি গো তুমি?
ভেবে নিয়েছ বুঝি?
দীপালী ঘোষেরা শুধু
দুঃখই দিতে জানে!
না গো,ওরা যে দগ্ধও হতে জানে।
সারাটি জীবন ধরে
অনুতাপের তীব্র দহনে।
সে দহন যায় না গো দেখা
না যায় দেখানো ;
অনির্বাণ চিতায়
জ্বলে যাওয়ানিরন্তর।
এই জীবনে কভু
হবে নাকি
সেই শাপমোচন?

FANTASTIC ♥♥♥
উত্তরমুছুন