গ্রন্থ আলোচনা
সবুজ শামীম আহ্সান বর্তমান সময়ের
একজন প্রতিশ্রুতিশীল আধুনিক কবি। আধুনা সময়ের প্রতিনিধি। আধুনিক শব্দটি
‘সাম্প্রতিক’ শব্দের সমান্তরাল। অর্থাৎ এ যুগের যা ধর্ম, যা জীবনদর্শন, যা চেতনা
তা-ই আধুনিকতা। কবিতায় আধুনিকতা একটি বিশেষ বোধ ও বিশেষ মনন ভঙ্গি যা কবি সবুজ
শামীম আহ্সানের সদ্য প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘গোধূলির পানকৌড়ি’র কবিতাগুলোতে
পর্যবসিত। জন্মভূমির প্রতি আত্মিক নৈবেদ্যের ডালি সাজিয়ে তিনি লোক লোকান্তরে
নিজেকে প্রতিস্থাপিত করতে নিরলস শিল্প স্রষ্টার ভূমিকা পালনে তৎপর।
কবিতার সৌকর্য বৃদ্ধিতে কবি আশ্রয়
নিয়েছেন পৌরাণিক মিথ ব্যবহারের। শব্দ ভাঙচুর, চয়ন ও প্রয়োগে কবি সবুজ শামীম আহ্সানের
প্রশান্তিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। কবি চেতনা সংশ্লেষণী অধিত চিন্তায় নিমজ্জমান সত্তায় যেন
সম্বিত সন্ধান করেন নিজ ব্যষ্টিক অনঙ্গ বৈশিষ্ট্যে। স্থুলদৃষ্টি অতিক্রম করে তিনি
যেন ডুব দেন অন্তর্দৃষ্টির পর্যবেক্ষণে। মনঃকাল লগ্ন হৃদয় সচেতন সঞ্চারিত বোধি কবিকে
আচ্ছন্ন করে। তিনি হয়ে ওঠেন নিসর্গ প্রীতিতে বিভোর। সেই সুর স্পষ্টতর হয়ে ধরা পড়ে
তাঁর কবিতায়, যখন তিনি বলেন- ‘উজানে গুণটানা মাঝির দেহের ভাঁজে দেখবো/ তেরশত নদীর
বেহেশতি বাগান’। তিনি তৃতীয় নয়ন মেলে উপলব্ধি করেন- ‘বৈধব্য বিকেলকে গ্রাস করছে/
অপদেবতার অংশীদার’।
অনুভূতি দিয়ে একটি স্বতন্ত্র মনোজগত
তৈরি করতে হলে প্রতীক বা রূপকের সাহায্য অনিবার্য। শব্দে প্রতীকীর অনুপম প্রয়োগ,
উপমায় বাকলয়ের চাতুর্য, কবিতার অর্থবোধক দ্যোতনা, অন্তর্দৃষ্টির প্রখরতায় সবুজ
শামীম আহ্সান এখানে আত্মস্থ। একজন ধ্যানস্থ কবি। শিল্পের খাতিরে তিনি ধ্যানস্থ হতে ভালোবাসেন। যা
প্রকৃত শিল্পীর পরিচয় বহন করে।
সবুজ শামীম আহ্সান কখনো কখনো
জীবিতা সমাচ্ছন্নের মাঝে অনুসন্ধিৎসায় খুঁজে ফেরেন ঘুণলাগা করিডোর। যে করিডোরে
কষ্ট নিবিড়ভাবে গেঁথে আছে। কবির বহুমাত্রিক শব্দদ্যোতনার দ্যুতিতে যা উচ্চারিত
হয়েছে অখণ্ড গুঞ্জরণে। সেই ব্যাকুল আত্মার নিনাদিত সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের
আত্মউন্মোচনে উন্মুখ কবি। কবিতার আত্মা ও
শরীর নির্মাণেও তাঁর দক্ষতার পরিচয় মেলে। তাঁর কণ্ঠে নিবিড়ভাবে অনুরণিত হয়- ‘শ্রমিকের
বুকে শিশিরের চুমু/ বিকেলের কবিতায় গোধূলির পানকৌড়ি’।
প্রেম অস্থিতিশীল মানব মনের অদ্ভুত
এক সংবেদনজাত অনুভূতির বিশ্বস্ত অভিব্যক্তি। প্রেম স্বর্গীয় সুধার অনির্বচনীয়
ঝর্ণাধারা। এর গতি প্রকৃতি রহস্যপূর্ণ গোধূলি আঁধার। যে গোধূলির আবির রঙ ক্ষণিকে
মনোমুগ্ধকর আবেশ ছড়িয়ে মুহূর্তে লীন হয় অন্তরের গর্ভে। হারিয়ে যায় সে রঙের ফাগ। প্রেমের সেই
স্বরূপ উন্মোচনে কবি বিমূর্ত চিত্র আকেন তাঁর বাক কলাকুশলতায়। তিনি উচ্চারণ করেন- ‘যে জীবনে ভালোবাসা নেই সে জীবন মানুষের নয়’
কিংবা স্বগতোক্তি করে বলে ওঠেন- ‘কবিরাই জানেন প্রেমের ভেতরে থাকে জীবনের
পূর্ণতা’।
এই কাব্য পাঠে একজন সৃষ্টিশীল
আত্মমগ্ন কবির স্বরূপ চিনতে একটুও বেগ পেতে হয় না। তাঁর কবিতায় আছে নানাবিধ
পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং যাপিত জীবনের সমূহ যন্ত্রণা ও হৃদয়জাত সুকুমার অনুভূতিকে
ভাষিক উৎকর্ষে শৈল্পিক নির্মাণের সমৃদ্ধ প্রয়াস। পাঠক তাঁর কবিতা পাঠে
ভিন্নমাত্রিক স্বাদ পাবেন বলে আমি মনে করি।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন