গ্রন্থ আলোচনা
বিদীর্ণ বোধের সওয়ারঃ প্রিতম গোর্কি
আধুনিক বাংলা
কাব্যসাহিত্যে আশির দশকের একজন বিশিষ্ট কবি প্রিতম গোর্কি। কবিতা ও ছোট গল্পের
মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ। ‘বিদীর্ণ
বোধের সওয়ার’ তাঁর সাম্প্রতিক কাব্যগ্রন্থ। প্রকাশিত
হয়েছে এবারের একুশের বইমেলায়। গল্পে পারদর্শিতা থাকলেও কবিতায় তিনি আরও বেশি
নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছেন।
জীবনের বিচিত্র পথে তাঁর কবিতার শৈল্পিক পদচারণা। সমাজ সংস্কৃতি ও রাজনীতির সংঘাতময় বিবর থেকে ঘটেছে তাঁর কবিতার মনোরম আবির্ভাব। রাজনীতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তাঁর অনুভব ও সাহসী উচ্চারণ হয়ে উঠেছে অত্যন্ত বাস্তবতাস্পর্শী। কবিতার আপন ভুবনে প্রিতম গোর্কির বিচরণ সবিশেষ স্বচ্ছন্দ ও স্বতঃস্ফূর্ত।
জীবনের বিচিত্র পথে তাঁর কবিতার শৈল্পিক পদচারণা। সমাজ সংস্কৃতি ও রাজনীতির সংঘাতময় বিবর থেকে ঘটেছে তাঁর কবিতার মনোরম আবির্ভাব। রাজনীতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তাঁর অনুভব ও সাহসী উচ্চারণ হয়ে উঠেছে অত্যন্ত বাস্তবতাস্পর্শী। কবিতার আপন ভুবনে প্রিতম গোর্কির বিচরণ সবিশেষ স্বচ্ছন্দ ও স্বতঃস্ফূর্ত।
বিভিন্ন সময়ে অসাধারণ জ্ঞান অর্জন, বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা, শব্দ কোষে পরিণত হওয়া, জীবনের উদ্বোধনে বিস্ময়কর অন্তঃজাগরণ, যুগের নির্ভরযোগ্য সমাজ বাস্তবতার চিত্র অংকন, যুগ জটিলতার ব্যাখ্যা নিরূপণ, সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের কাছে কবির দায়বদ্ধতা তাঁর কবিতাকে উদ্ভাসিত ও সৌকর্যমণ্ডিত করেছেন।
কবি প্রিতম গোর্কি একজন পিপাসার্ত পাঠক। তিনি একাধারে পাঠ করেছেন বিশ্বের খ্যাতনামা কাব্যসমূহ, বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, ভূগোল, গ্রীক দর্শন, ইসলামী ও আধ্যাত্ম সুফিদর্শন, পুরাণ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত, বাইবেল, কোরআন, ফ্রয়েডীয় মনোসমীক্ষণ, ম্যাকিয়াভেলীয় রাজনৈতিক চিন্তাধারা, মার্কসবাদ, সমাজতান্ত্রিক, মনস্তাত্ত্বিক ও বস্তুবাদী দর্শন। ফলশ্রুতিতে, তাঁর কবিতা বিবিধ জ্ঞানের সমন্বয়ে নান্দনিক উৎকর্ষে ভিন্নমাত্রিক ব্যঞ্জনা পেয়েছে।
কবি বৈষয়িক বিচিত্র বিশ্বে নিয়ত বিচরণশীল এক সত্তা। তাঁর
কবিতা ও কাব্যভাবনাও তাই বিচিত্র ধারায় যেন এক শব্দকৌশলী ভাবময়তা, নিসর্গপ্রীতি মানবীয় সকল কর্মকাণ্ডের নিষ্ঠুর বাস্তব বাণীচিত্র
মানসসরোবরে এঁকে যায় এক স্বপ্নিল ভোরের দৃঢ় শপথ, যা
হৃদয়ের গভীরে সৃষ্টি করে অন্য জগত-অন্যমন।
‘শরীরময় হাওয়ায় হাওয়ায় মাতোয়াল সন্ধ্যা’ আর ‘জানালা গলে মাধবীলতার দুরন্ত কিছু ডগা’ ছুঁয়ে যাওয়া মন, ‘অন্ধকার গলিপথে নব্য নেশাতুর’ মানুষ, গভীর রাতে ‘নিষ্ফলা শস্যের ক্রন্দন’ কবিকে ক্রমশ ‘হৃদপিণ্ডের অতল গহ্বর থেকে’ সৃষ্ট জীবনবোধের এক ঘনিষ্ঠ জগতে নিয়ে যায়। এই অনুভূতির দোলাচলতার অনুরণনে কবির মনে জেগে ওঠে অস্থির সময়ের বাঙময় প্রকাশ ইচ্ছা। প্রকাশ ইচ্ছা ও বাঙ সমন্বয়ের মাঝে কবি তাই এখানে ‘বাক’ দিয়েই শিল্পশৈলী মণ্ডিত সুন্দর শব্দকলি সংযোজনে এক অনুপম শব্দ পঙ্ক্তির অবকাঠামো নির্মাণে স্রষ্টা ও দ্রষ্টার ভূমিকা পালন করেন।
এই কাব্যগ্রন্থে এমন কিছু কবিতা অঙ্কিত হয়েছে, যে কবিতায় পাঠক সহজেই খুঁজে পাবে নিজের মুখের স্বচ্ছ আদল। কবি
ব্যক্তিগত হৃদয় সংক্ষোভ ও জাগতিক যন্ত্রণার প্রতিফলনকে শিল্পের চূড়ান্ত মাত্রায়
পৌঁছে দিয়েছেন। যে কারণে তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছে পাঠকের চিন্তার খোরাক। এখানেই কবি
শিল্প সৃষ্টিতে অনুধ্যায়ী। ঘটমান মানব চরিত্র বিষয়ক চিত্র অংকনে সার্থক স্রষ্টা
হিসেবে তাঁকে অনুমান করা মোটেও কষ্টসাধ্য নয়।
আবেগ অনুভূতিকে ঘিরেই কবিতার সৃষ্টি এবং তার আবেদনও পাঠকের আবেগ অনুভূতির কাছে। পৃথিবীতে যতদিন মানুষের আনন্দ-বেদনা, আবেগ-অনুভূতি, হাসি-কান্না, প্রেম-অপ্রেম, শুভ-অশুভ, সংস্কৃতি-অপসংস্কৃতির অস্তিত্ব থাকবে ততদিন আপন ঐশ্বর্যে স্বমহিমায় টিকে থাকবে কবিতা।
একজন সমালোচকের সাথে সবাই একমত হবেন এমন আশা করা সমীচীন
হতে পারে না। আমার বিশ্বাস প্রিতম গোর্কির কবিতায় সুশৃঙ্খল শব্দবিন্যাস, শব্দের বিচিত্র সম্ভাবনা, মনোরম ধ্বনিগুঞ্জন
এবং সম্মোহিত কাব্যসুরভির সাবলীল নির্মাণ কৌশল পাঠকের কাছে হয়ে উঠবে আস্বাদ্য ও
আকর্ষণীয়।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন