অ্যাক্ট অফ ভ্যালর এবং সুমিত চক্রবর্তী


                                            সুমিত চক্রবর্তী        

সুমিত চক্রবর্তী। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী একজন সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব। তিনি একাধারে একজন কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও বিদগ্ধ সমালোচক। কবি সুমিত চক্রবর্তীর জন্ম মাদারিপুর জেলার শিবচর থানার গুয়াতলা গ্রামে। তাঁর পড়াশোনা ইংরেজি সাহিত্যে। সুমিত চক্রবর্তী কর্মজীবনের পাশাপাশি একটি আন্তর্জাতিক পত্রিকায় সাহিত্য ও সমসাময়িক চিন্তা বিষয়ক অতিথি লেখক হিসেবে কর্মরত। এছাড়া SWAF নামে একটি সমাজসেবামূলক সংস্থা যা কিনা গরীর শিক্ষার্থীদের শিক্ষা গ্রহনে অর্থনৈতিক ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করে তার প্রধান শিক্ষা সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন। তিনি সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুদের নিয়ে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান 'Smile Creator-মানবতার পাশে' এর উপদেষ্টা নিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। 

তিনি বর্তমানে রিসার্চ করছেন existentialism (অস্তিত্ববাদ) এর উপর। তাঁর সহযোগী হিরোইউকি সানাডার। ‘অস্তিত্ববাদ’ বিংশ শতাব্দীর একটি আলোচিত মতবাদ। কবিতায় একজিস্‌টেনসিয়ালিজমের প্রবক্তা হিসেবে গণ্য করা হয়  ফরাসী কবি জাঁ আর্তুর র‌্যাঁবোকে, যিনি সুররিয়ালজম আন্দোলনেরও প্রধান পুরুষ, এক বিস্ময়কর কবি। অস্তিত্ববাদের এই আন্দোলনে চরম আঘাত হানে ১৯৪০ সালে জঁ-পল সার্ত্র্, আমেরিকা নতুন করে জেগে ওঠে এই আন্দোলনে। দর্শনেও এর প্রভাব কম নয়। ফ্রিডরিখ নীটশে, জঁ-পল সার্ত্র্, মার্টিন হাইডেগার প্রমুখ হলেন অস্তিত্ববাদী দার্শনিক, যারা অস্তিত্ববাদ নিয়ে দিয়েছেন তাঁদের নিজস্ব দর্শন। 

যাই হোক, সুমিত চক্রবর্তী সম্পর্কে ধারণা দিতে গিয়ে কিছু বিষয়ের অবতারণা করতে হল। সুমিত চক্রবর্তী নিয়মিত বহুবিধ জ্ঞান চর্চার দ্বারা বোধের জগত পরিশীলিত করে চলেছেন এবং তার প্রয়োগের স্বাক্ষর রাখছেন অসাধারণ সব সৃষ্টির মাধ্যমে। তাঁর কবিতা দর্শন নির্ভর। যে দর্শন পরাবাস্তবতা, জাদুবাস্তবতা, সুফিজম  এবং সুররিয়ালিজমের পথ ধরে হাঁটে। আবার কখনো এর গতায়ন অস্তিত্বের শেকড় সন্ধানের লক্ষ্যে। তাঁর একটি কবিতা সম্পর্কে কিছু কথা বলার জন্য এই আলোকপাত। তাঁর লেখা কবিতাগুলোর মধ্যে 'Act Of Valor' একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা। স্বাধীনতা নিয়ে লেখা এই কবিতাটি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উপস্থাপন স্বরুপ ৬ জানুয়ারি, ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক পুরস্কার পায়। দেশের প্রতি সম্মান রেখে বিশ্ব দরবারে জন্মভূমির পরিচিতির জন্য এই কবিতাটি একটি মাইক ফলকও বটে।

তাঁর 'Act Of Valor' কবিতাটি তুলে ধরছি-

Act Of Valor

I had a dream, A dream of a world,
Where the flowers bloom without the fear of death,
Where the birds sing of sprightly joy without the fear of suffocation,
Where the children smile of innocence without the fear of being rebuked upon ,
Where the wind caresses the nature to flow heavenly glow Without the fear of violation,
Where the wills soar high Without the fear of the wings being cut through,
 
Where blessing of peace can flow in an un ending way Without the fear of being conspired upon.
NO !
It’s a flaw !
That wasn’t a mere dream !
Rather a vision, a longing, a sacred wish
…
An incantation of revolution,
An enchanting holy hymn of inspiration.
It came then
It came as the mighty wave comes;
That is irresistible.
It came as the lightning comes ,
Blinding the fear of extinction.
It came as the “Ark” of Noah came.
And the savior it became,
The savior of love, serenity, innocence, judgment, will, wisdom
 
And Freedom.
It came like the unsurpassable omnipotent.
What is this “It’’ then?
It is neither a man nor a community.
It is the will,
The will ,regardless of cast ,creed and gender. 
The will of oppressed, tortured, bashed, deprived, humiliated, raped and killed.
It came swinging with utmost might
Saving the flowers from the death plight.
Unleashing the valor like warriors in precision,
Like the mount Olympus is standing up on.
Courage ignited, Backlash commenced,
Fire flickered in swords.
Blood watered the field, The field of glory,
There grew a plant BANGLADESH, In the field of glory.
When the dawning sun strikes 16th December, the first of nineteen seventy.
The tender plant Bangladesh is synonymous to freedom,
Who has her root enrooted in patriotism.

Date:9 December, 2013.

কবি সুমিত চক্রবর্তীর লেখা 'Act Of Valor' কবিতাটি আমাদের স্বাধীনতাপূর্ব মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতালাভকে চিত্রায়নের প্রচেষ্টায় সৃজিত । অনেকেই কবিকে এই প্রশ্নটি করেছেন, যে স্বাধীনতার কবিতা তিনি কেন বিদেশী ভাষায় লিখেছেন? উওরে কবি বলছেন, "যে মানুষ যেমন তাদের পরিহিত অলংকার নিজের সৌন্দর্য বর্ধনে অন্যের নিকট প্রকাশ করে তেমনি আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। স্বাধীনতা আমাদের জাতির হিরকোজ্জ্বল দ্যুতির ন্যায় দেদীপ্যমান অলংকার। তাই আমাদের এই একান্ত আপন অলংকারের সদা ভাস্বর বিকোচন্মুখ সৌন্দর্যময় রূপকে কুক্ষিগত করে না রেখে ব্রহ্মাণ্ডের সকলকে আস্বাদনের সুযোগ দেবার প্রয়াসেই ইংরেজিতে কবিতাটি লেখার সাহস করেছি। চেষ্টা করেছি বিশ্ববাসীদের জানাতে আমাদের দেশাত্মবোধ, আত্নত্যাগ,ভালবাসা ও মৃত্যুঞ্জয়ী যোদ্ধাদের সাহসিকতাকে।"

'Act Of Valor' কবিতাটি একটি সম্পূর্ণ দৃশ্যমান কল্পনা যা বাস্তবিক প্রতিবিম্বিত ফল রূপে বর্ণিত। কবিতাটি লিখতে কবিকে চলে যেতে হয়েছিল সেই একাত্তরের আগুনঝরা দিন গুলিতে। নিজেকে কল্পনা করেছেন অসহায়, মাতৃকোল বিতাড়িত, নিজেকে হারিয়ে খুঁজতে থাকা, অত্যাচারিত, পিঠে দেয়াল ঠেকে যাওয়া একজন বাঙ্গালি হিসেবে, যার পশ্চাৎবিমুখতা  আর অসহায়ত্বই ছিল তার স্বাধীনতার স্বপ্নদৃষ্ট।
দুর্বিনীত পাক-হানাদারেরা যখন বাঙ্গালিদের উপর শত অত্যাচারে, শত নিপীড়নে তাদের জন্মগত দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছিল তখন সেই ভীরু কাপুরুষ নামে পরিগণিত অন্যায়ের যাঁতাকলে পিষ্ট পবিত্র আত্মাগুলি স্বপ্ন দেখছিল।

তারা স্বপ্ন দেখেছিল এমন এক ভূখণ্ডের যেখানে ফুলেরা ফুটবে মৃত্যু ভয়হীন, যেখানে পাখিরা গাইবে আনন্দের গান,যেখানে শিশুদের নি:ষ্পাপ হাসি আলোকিত করবে ভুবন,যেখানে ইচ্ছেরা উড়বে সীমাহীন উচ্চতায়,যেখানে শান্তির স্রোত মিশবে স্বর্গের মোহনায়।

নাহ্‌! বাঙালির কাছে সেটা শুধু স্বপ্ন ছিলনা, ছিল মন্ত্র,অধিকার আদায়ের মন্ত্র, নিজেকে তথা দেশমাতৃকা কে আরো আপন করে ভালবাসার অধিকার আদায়ের মন্ত্র, স্বকীয়তা, জাতীয়তাবাদের পুনঃরুত্থানের মন্ত্র, আজন্ম লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নে অভ্যুত্থানের ডাক।

স্বপ্নেরা এলো, বীরবিক্রমে সমুদ্রের জলোচ্ছাসের ন্যায় অসীম অপ্রতিরোধ্য তীব্রতা নিয়ে। ধুয়ে মুছে দিল কালের অতলে তলিয়ে যাবার নিকৃষ্ট ষড়যন্ত্রকে। স্বপ্নেরা এলো ভালবাসা, শান্তি, সৌন্দর্য, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, ইচ্ছা, নিষ্কলুষতা, ন্যায়বিচার, প্রেরণা ও স্বাধীনতার রক্ষক হয়ে। যেমনি নবী নূহ (আ:) এসেছিলেন, গড়েছিলেন তাঁর নৌকো ঈমানের রক্ষায়।

ঠিক তেমনি বাঙ্গালির স্বপ্নেরা এলো যেন সর্ব শক্তিমান ঈশ্বরের ইচ্ছের বাহনে চড়ে। 
বেলা গড়িয়ে সূর্যের রং যতই লাল হয়ে বাঙালির সবুজ অধিকারে প্রতিফলিত হতে থাকল, দল মত শ্রেণী নির্বিশেষে অসহায়, অত্যাচারিত, অপমানিত, ধর্ষিত, নিহতদের ইচ্ছেরা ততই প্রবল হতে লাগল। আহত বাঘের গর্জনের ন্যায় অঘোষ, ধনুক হতে সদ্য মুক্ত তীরের ন্যায় অমোঘ, সুতীব্র আর্তনাদ রূপ নিল ধনুক ভাঙ্গা পনে। বাঙ্গালিদের ইচ্ছেদের মহামিলনের ডাকে প্রকম্পিত হল কলংকের আকাশ। ব্রক্ষ্মান্ডের প্রতিটি ধূলোয় বাংলামাতৃকার নামাঙ্কনের স্বপ্নে বিভোর বাঙ্গালিদের সাহসেরা জ্বলে উঠল তাদের লাল রক্ত আরো লাল করবে বলে,বাংলা মায়ের আরক্ত মুখের লজ্জা ঘোচাবে বলে,বাংলার মাটি অপবিত্র করার চেষ্টা মাত্র করেছিল যারা তাদের রক্তে স্নান করবে বলে।

যুদ্ধ হল। আগুনের ফুলকি ছোটালো তরবারিতে ইচ্ছের সাহসেরা। হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনলো তারা গৌরবের ভূমিকে ত্যাগ,তিতিক্ষা ও সাফল্যের রক্তে স্নান করিয়ে।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের ১৬ তারিখ সূর্যদয়ে সেই রক্তস্নাত, পবিত্র ভূমিতে দেশপ্রেমের শিকড়ে জন্ম নেয় ছোট্ট সবুজ, সজীব একটি চারাগাছ, বাংলাদেশ, যার আরেক নাম স্বাধীনতা।

কবি সুমিত চক্রবর্তী বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে বিশ্বের দরবারে তাঁর কবিতার মাধ্যমে উপস্থাপন করার ভেতর দিয়ে দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি তাঁর সমৃদ্ধ সাহিত্যকর্ম দিয়ে বাংলা সাহিত্যকে ভবিষ্যতে আরও সমৃদ্ধ করবেন এবং সেই সাথে বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে বিশ্বের দরবারে এভাবেই প্রাণবন্ত করে উপস্থাপন করবেন সেই আশা রাখি। তাঁর অনন্য প্রতিভার করস্পর্শে বাংলা সাহিত্য ঐশ্বর্যমণ্ডিত হোক। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাশিয়ার কবিতা

তোমার জন্য রজনীগন্ধা দিন

জার্মানির কবিতা