ছোট গল্প
ঘাসফড়িংয়ের প্রথম প্রেম
রুবেল পারভেজ
রুবেল পারভেজ
জুঁই, কত্তোদিন পর তোর সাথে দেখা তাই না? স্বামী সংসার নিয়ে নিশ্চয়
খুব সুখে আছিস? তোর কোন ছেলেপুলে নেই? ও একটা ছেলে? রায়হান! বেশ সুন্দর নাম। আমার
কথা বলছিস? বিয়ে? হাসালি। আমার মত এমন বেপরোয়া ছন্নছাড়া ছেলেকে কে মেয়ে দেবে বল?
প্রেম? তাও আবার আমার মত মানুষের কপালে? ওসব প্রেম ট্রেম আমার ধাতে নেই। হ্যারে,
দীপালীর কি খবর? বেশ সুখে আছে তাই না? হা-আ! থাকারই তো কথা ওই রকম কোটিপতি বাপের
সাদা মুলা টাইপ ছেলেকে বিয়ে করে ভালো না থাকার কি আছে? ওর মত সুন্দরী মেয়েরা তো
টাকার কাছে পোষ মানে। সেই কলেজ জীবন থেকেই তো দেখে আসছি টাকাওয়ালা লোফার টাইপ
ছেলেদেরই মেয়েরা বেশি পছন্দ করে?
তোর তো বেশ গানের গলা ছিল, এখনও গান করিস? না? কেন? তোর সেই
হারমোনিয়ামটা কি এখনও আছে? নেই? তোর স্বামী পছন্দ করে না? তুই কি এখনও চাঁদনী রাতে
খোলা ছাদে বসে চাঁদ দেখিস? রবীন্দ্র কিংবা নজরুলের গানে এখনও হৃদয় করে তোলপাড়?
এখনও কি গুণগুণ করে গলা ভাজিস হেমন্তের গানে? এখনও কি মাঝরাতে বৃষ্টি হলে বৃষ্টিতে
ভিজিস? 'তোর পুরুষ সে তো জানে না বোঝে না মাঝরাতে বৃষ্টির অর্থ কি? মাঝরাতে বৃষ্টি
এলে কেন তুই ভিজে যাস? তখন কে তোকে বাজায়? তখন কার কণ্ঠে গান গায় একান্তের
স্মৃতি?' এত দীর্ঘশ্বাস কেন? সংসারে তোর সং সেজেই সার হল। তোর মত অনেক মেয়েরই সব
শখ আর প্রতিভার জলাঞ্জলি হয় সংসারের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে।
আমাকে বিয়ে করবি? এখন কেন বলছি? যখন বলার ছিল তখন যোগ্য ছিলাম না।
মনে আছে হাসলে তোর গালে টোল পড়ে বলে সাগর ভাই তোকে প্রীতি বলে ডাকতো? আর আমি তোকে
লক্ষী বলে ডাকতাম। মনে আছে একদিন তুই আর আমি, তোর সাথে তৃতীয়বারের মত যেদিন দেখা?
তোদের বাড়ির পাশে নদীর পাড়ে বসে আমি, তুই আর আমার খালাতো বোন অনেক আড্ডা
দিয়েছিলাম? সেদিন তুই যখন 'তুমি রবে নীরবে' আর 'লাল বেনারসি ' গান শুনিয়েছিলি আমি
তখনই তোর প্রেমে পড়ি, আর দ্বিতীয়বার যখন দেখা হয়েছিল তখনই তোর প্রতি ভালোলাগার
শুরু। তবে তুই আগেই আমার বোনের কাছে বলেছিলি তুই আমাকে পছন্দ করিস। তোর মত অত
সুন্দরী আর গুণী মেয়েকে আমি ফেরাতে পারিনি, কারণ আমিও তোকে মনে মনে পছন্দ করে বসে ছিলাম।
তুই আমার প্রথম প্রেম। আমার হৃদয়ের বাগানের ডানা মেলে ওড়া প্রথম প্রজাপতি।
ঘাসফড়িংয়ের প্রথম প্রেম।
এই বার বিয়ে করবো? বিয়ে যে করবো ভালো মেয়ে পাচ্ছি না। ভালো মেয়ের
বড় অভাব। সব ভালো মেয়েগুলো মনে হয় গুম হয়ে গেছে। হাসছিস? শোন, একটা কথা বলি, মনে
কর তুই প্রতিদিন একটা ব্রাশ দিয়ে দাঁত ব্রাশ করিস, একদিন দেখলি যে অন্য একজন তোর
ওই ব্রাশটা দিয়ে ব্রাশ করেছে, তাহলে কি করবি? পারবি আর ব্রাশ করতে? বেশির ভাগ
মেয়েরাই এখন তাই, কেউ না কেউ একবার ব্যবহার করেছে। এই যে একা আছি। বিন্দাস আছি।
একদম ঝাড়া হাত পা। যেখানে খুশি যাও, যা মন চায় করো, যত রাতে মন চায় বাসায় ফেরো, না
চাইলে ফিরো না। কেউ কিচ্ছু বলবে না। ‘মেয়েরা তো সন্তান উৎপাদনের মেশিন’। ওরে বাবা
এভাবে তাকাচ্ছিস কেন? এটা আমার কথা না সুনীল জ্যেঠু বলেছেন। আর শোন একটা বিরক্তির
কথা বলি। আমার পাশের ফ্ল্যাটে আমার এক বন্ধু থাকে। তার বউয়ের কাণ্ডকারখানা দেখলে
মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে যায়। স্বামী বাসায় ফিরতে একটু দেরি করলে বাড়ি মাথায় করে ফেলে।
রাত সাড়ে এগারোটা বাজলেই হাতে মোবাইল নিয়ে কল দিতেই থাকে। আস্তে আস্তে মুখ গোমড়া
করে। রাত বারোটা বাজলেই কাঁদতে শুরু করে। তারপর বাবা-মায়ের কাছে ফোন করে বলে, তোমাদের
জামাই ঠিক সময় মত বাসায় ফেরে না, আমাকে নিয়ে যাও আমি আর সংসার করতে পারবো না। আমার
কাছে এসে বলে পারভেজ ভাই? আপনার ভাইকে একটা ফোন করেন তো, ফোন ধরছে না? আমিও
কয়েকবার চেষ্টা করি ফোন ধরে না, কারণ সে বেশি দূরে যায় না, বনানী বাজারে বসেই
বন্ধুর দোকানে আড্ডা দেয়। বউ সব জানে তারপরও কাহিনী করে। বোঝ কি রকম হাড় জ্বালাতন
করে মহিলারা। অস্থির।
তুই হয়তো এতক্ষণে আমাকে নারী বিদ্বেষী ভাবছিস। আরে না। ওরকম কিছু
না। তুই জানিস আমি চিরকাল একটু স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড। তাই ভালো লাগুক চাই না লাগুক।
বিয়ে তো একটা করতেই হবে? কি বলিস? তাহলে ভালো একটা সুশীলা মেয়ে খুঁজে দেখ আমার
জন্য। আমার কাউকে পছন্দ হয় না, যদিও কাউকে পছন্দ হয়, ওই যে একই অবস্থা, ব্রাশ করা।
তবে কেউ যদি আমাকে বিয়ে করে আমার আপত্তি নেই। মেয়েটা তোর মত হলেই চলবে। জুঁই,
ভাবছিস আমি আগের মতই এখনও বেশি বকবক করি? আমি এরকমই। আমি ঠিক আমার মতো।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন