একক কবিতার আলোচনা

নগরীর মৃত সময়ঃ তানভীর মুছলিমী রামেন

কবি তানভীর মুছলিমী রামেন বর্তমান প্রজন্মের একজন সম্ভাবনাময় তরুণ কবি। তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে যুগ যন্ত্রণার বাস্তব চিত্র। সময়ের ক্ষতকে তিনি আবিষ্কার করেছেন তৃতীয় নয়ন মেলে। তাঁর কবিতার গতিময়তা, ছন্দের কারুকাজ, চিত্রকল্প, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, ব্যঞ্জনা চোখে পড়ার মত।
অস্থির সময়ের দোলাচলতায় অনুরণিত বিষণ্ণ কবির মনের তুলিতে চিত্রিত হয়েছে কংক্রিট বান্ধবহীন নগরের মৃত সময়ের নিষ্ঠুর বাস্তবতার চিত্র। কবির চাওয়া পাওয়া যেন ইট কিংবা কাঁচের দেওয়ালে থমকে যায়। উত্তরের মাতাল হাওয়া ভাদ্র কিংবা শাওন মাসে যখন কবির কানের কাছে শিস বাজিয়ে কবিকে হৃদয়ের তপোবন বৃন্দাবনে ডাকে, তখন দূরের কী এক করুণ সুর কবিকে ব্যথিত করে। কবির ঘর গেরস্থালিতে বেদনার বাসা বাঁধে।
নিজের সাথে নিজেই মীমাংসা করে নেন ভালো থাকা মন্দ থাকার। মিলিয়ে নেন যাপিত জীবনের সুদকষা। নিজের কষ্ট নিজের ভেতরেই পুষে রাখেন। কর্মব্যস্ত শহরে কাজের ফাঁকে যেন ফুসরত নেই। সবার পায়ে এক অদৃশ্য শিকল বাঁধা, যে শিকল আমাদেরকে প্রতিনিয়ত অনুভূতিহীন রোবটে পরিণত করছে।
ধূলি ধূসর এই মৃতের নগরীতে ইচ্ছাগুলো যেন আহত ডানাভাঙা পাখির মত নির্বাক নিমীলিত চোখে পড়ে থাকে। দূর দিগন্তের শ্যামল সুর কবির দিকে নির্বিকার চাতক চোখে চেয়ে থাকে। কবির সকল চাওয়া উথাল হাওয়ায় শাওন স্নানে ইট পাথরে থমকে যায়, আবার ভ্রান্ত পথিকের কষ্টের মত প্রচণ্ড প্রখর রোদে নিনাদিত হয়ে যেন কবিকে থামিয়ে দেয়। অনেকটা বাদুড়ের পথচলার মত। শব্দত্তোর তরঙ্গ সৃষ্টির মাধ্যমে বাদুড় পথ চলে। বাদুড় চলার পথে ক্রমাগত বিভিন্ন কম্পাংকের শব্দোত্তর তরঙ্গ সৃষ্টি করে। এই তরঙ্গ কোন প্রতিবন্ধকে বাঁধা পেয়ে প্রতিফলিত হয়ে বাদুড়ের কানে ফিরে আসে। শব্দ ও প্রতিধ্বনির মধ্যবর্তী সময়ের পার্থক্য থেকে বাদুড় প্রতিবন্ধকের অবস্থান এবং আকৃতি সম্পর্কে ধারণা করতে পারে এবং চলার সময় সেই প্রতিবন্ধক পথ পরিহার করে চলে।
কাঁচ ঘেরা বন্দি শহরের কাঁচের দেয়াল কবির সাথে কথা বলে, এযেন আত্মার সাথে কথোপকথন। ভেতর থেকে একটা অশ্রুত স্বরে কাঁচের দেওয়ালের আদলে কেউ যেন তাঁকে বলছে, এই নগরীর ভীষণ খেয়াল, চতুর্দিকে কাঁচের দেয়াল,/ বলে আমায়, বন্দি কিসের? আকাশ দেখো দু'চোখ মেলে!/ উত্তুরে মেঘ, বৃষ্টি দ্যাখো, দূর দিগন্তে ইট পাথরের সৃষ্টি দ্যাখো,/ হঠাত করে ভাগ্যে পাওয়া রঙ-ধনুকের কৃষ্টি দ্যাখো,/ শুধুই দ্যাখো, হাত দিয়ো না, পা নিয়ো না, শেকল খুলে...
নাগরিক বিলাসিতা কবির গলায় ফাঁসের মত ঝুলে আছে। এই বিলাসিতার জীবন ক্ষণিকের ভুলে তছনছ হয়ে যেতে পারে।
ঊথাল হাওয়ার শিসে কবি বাতাসের হাত ধরে মধুর আঁচে পুড়তে চান না। তাই উথাল হাওয়ার প্রতি কবির আহ্বান- উথাল হাওয়া, রহম করিস, কাটিস না শিশ, কানের কাছে/ কেমন করে তোর হাত ধরে, পুড়তে যাবো মধুর আঁচে?
ব্যস্ততার শহরে কবির ঘরের দরজাও যেন শেকল টানায় ভীষণ ব্যস্ত। কবির বুকের মাঝে ঝাপটানো সুর শকুন ডানায়। পিচ-টায়ারের বিহ্বলতায় কষ্টে-সৃষ্টে বেঁচে থাকা এই শহরের প্রথা। কপাল পড়া রেসের ঘোড়ার মত আমরা সবাই ছুটে চলছি উদ্দেশ্যহীন গন্তব্যে। বন্দি জীবনের ঘেরাটোপে আমরা শুধুই ছুটছি, ছুটেই চলেছি যেন এক মৃত সময়ের বিষণ্ণতায়।
শুকনো নিরস নিকষ সময় ঘোড়ার খুরের আঘাতে নিয়ত ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে, ভেঙ্গে যাচ্ছে শুকনো পাতার মত মর্মর করে মর্মের যাতনায়। ঘড়ির কাটা যেন টিকটিক শব্দে শাসিয়ে যাচ্ছে আমাদেরকে কর্মব্যস্ত পরাধীন নগর জীবনের নির্মম বাস্তবতায়। তাই উত্তরে মেঘ কিংবা উথাল হাওয়া কবির আহত হৃদয় আর ছুঁয়ে যায় না ভালো লাগার। অন্ধ মৃতের নগরীতে প্রতিদিন একটু একটু করে মরে যায় মানুষের সোনালি ইচ্ছেগুলো। পড়ে থাকে রিক্ত নিঃস্ব নগরীর মৃত সময়।
কবিরা সময়কে করপুটে ধারণ করেন। কবিরা সমকালে বেড়ে ওঠে, বিচরণ করে সর্বকালে। কবি তানভীর মুছলিমী রামেন তাঁর কবিতায় নগর জীবনের মানুষের নির্মম বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন অরূপ শিল্পিত সৌন্দর্যের বাতাবরণে। উন্মার্গগামী স্বেচ্ছাচারিতা আমাদেরকে একটু একটু করে গ্রাস করছে। আমরা অনুভূতিহীন মানুষে পরিণত হয়ে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত। কিছু জায়গায় অসমমাত্রিক মিল লক্ষ্য করা গেলেও কবির এই কবিতা ‘নগরীর মৃত সময়’কে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে আমাদের মানসপটে। কবির কবিতা বেঁচে থাক মৃত সময়কে উপেক্ষা করে। কবির সৃষ্টি আরও প্রাণবন্ত ও মুখরিত হোক, দেদীপ্যমান হোক আপন আলোর তেজস্বীতায়।

কবিতাটি উদ্ধৃত করছিঃ

নগরীর মৃত সময়
এক উত্তুরের উথাল হাওয়া, ভাদ্র কি বা শাওন মাসে,
ডাক দিয়ে যায় বৃন্দাবনের, শিশ কেটে যায় কানের পাশে,
হাতছানি দেয় দীঘল দূরের, কি এক অমোঘ করুণ সুরের,
হাঁক ছেড়ে কয়, 'আয় না সাথে, আয়'.... 

.
নিজের সাথে নিজেই যুঝি, কষ্ট আমার আমিই বুঝি,
দূরের হাওয়া, যা তুই দূরে, কেমন করে বুঝাই তোরে,
কাজের ডোরে দ্যাখ না আমার, শেকল বাঁধা পায়,
.
এই নগরীর ধুলোর বাঁকে, ইচ্ছেরা চোখ বুঁজেই থাকে,
দিগন্ত দূর, শ্যামল সে সুর, আমার দিকে চাতক চোখেই চায়,
উথাল হাওয়ায়, শাওন নাওয়ায়, আমার সকল অবুঝ চাওয়া,
ইট পাথরে থমকে গিয়ে, ভীষণ রোষের নিনাদ নিয়ে আমায় থামায়...
.
এই নগরীর ভীষণ খেয়াল, চতুর্দিকে কাঁচের দেয়াল,
বলে আমায়, বন্দি কিসের? আকাশ দেখো দু'চোখ মেলে!
উত্তুরে মেঘ, বৃষ্টি দ্যাখো, দূর দিগন্তে ইট পাথরের সৃষ্টি দ্যাখো,
হঠাত করে ভাগ্যে পাওয়া রঙ-ধনুকের কৃষ্টি দ্যাখো,
শুধুই দ্যাখো, হাত দিয়ো না, পা নিয়ো না, শেকল খুলে...
...
গলায় বুঝি অদেখা এক নিঠুর ফাঁসের সমন ঝুলে,
এই নগরীর ভীষণ ঠমক, ছিটকে যাবো খানিক ভুলে।
.
উথাল হাওয়া, রহম করিস, কাটিস না শিশ, কানের কাছে
কেমন করে তোর হাত ধরে, পুড়তে যাবো মধুর আঁচে?
.
আমার ঘরের দুয়ারখানি ব্যস্ত ভীষণ শেকল টানায়
আমার বুকের শব্দে শোনো, ঝাঁপটানো সুর শকুন ডানায়
এই শহরে বাঁচার প্রথা, পিচ-টায়ারের বিহ্বলতা,
কপাল পোড়া রেসের ঘোড়া, ছুটেই চলে দূর অজানায়
বন্দি হয়েও ছুটছি আমি, মৃত্ সময়ের বিষন্নতায়...
.
শুকনো সময় ঘোড়ার খুরে, ভাংছেরে শোন মর্মরিয়ে....
ঘড়ির কাঁটায়... এই নগরীর ঘড়ির কাঁটায়....
উত্তুরে মেঘ, উথাল হাওয়া, যা ফিরে যা, তোর ঠিকানায়....

রামেন, ২২/০২/২০১৭


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাশিয়ার কবিতা

তোমার জন্য রজনীগন্ধা দিন

জার্মানির কবিতা