ভূমিকা

বন্দি শিবির থেকেঃ শামসুর রাহমান


ত্রিশোত্তর আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমান। প্রথম জীবনে রোমান্টিকতার ভাবাদর্শে তাঁর কবিতা লালিত হলেও পরবর্তীতে তা রূপান্তরিত হয়েছে বিপ্লবের অগ্নিমন্ত্রে। তাঁর কবিতা যুগে যুগে সংগ্রামীদের প্রেরণা, অগ্রগামী মিছিলের স্লোগান।

একালের কবিতাকে সংজ্ঞায়িত বা এর চরিত্র বিম্বিত করতে গিয়ে প্রখ্যাত সমালোচক আবু সয়ীদ আইয়ুব বলেছেন- ‘এর চরিত্র অবিশ্বাসের, অনাস্থার, অমঙ্গল চেতনার, বিবমিষার, অবক্ষয়, ক্লেদ আর হতাশার। এ কবিতায় কোন সৌন্দর্যের অনুধ্যান নেই, মহত্ত্বের প্রত্যাশা নেই। কোন ভবিষ্যৎ নেই। নিজের কিংবা অন্য কারো প্রতি, সমাজ কিংবা দেশের প্রতি তথা মানুষের প্রতি কোন দায়দায়িত্ব এ কবিতা স্বীকার করে না’। তখন এ কবিতা সর্বগ্রাসী নাস্তিবোধ, অতলান্ত হতাশা, নিষ্ক্রমণহীন অন্ধকার এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুর্বহ ভারগ্রস্ততা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কথাটা ঘুরিয়ে বললে এ রকম দাঁড়ায় যে, প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর পৃথিবীর নীরন্ধ্র তমিস্রাকে ইতিহাস নির্ণীত পরিণাম এবং সভ্যতা ও মানবতার পতন মুহূর্তের মত দুর্লঙ্ঘ্য নিয়তি বলে মেনে নিয়েই রচিত হতে হবে এ যুগের কবিতা, আশা কিংবা উত্তরণের পথ বন্ধ করে দিতে হবে- নইলে সে কবিতা কোন ক্রমেই আধুনিক যুগোপযোগী কিংবা প্রগতিশীল সমাজ সচেতন শিল্প হবে না, ইত্যাদি। কিন্তু শামসুর রাহমান এ বক্তব্যকে স্বীকার করেন নি, বরং তাঁর দীর্ঘ সময়ের কাব্য সাধনায় তিনি কবিতাকে জীবনার্থে সৎশিল্পের নন্দনলোকে পৌঁছে দিয়েছেন।

১৯৭১ এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে রচিত হয়েছে শামসুর রাহমানের ‘বন্দি শিবির থেকে’ কাব্যগ্রন্থ। যুদ্ধকালীন বাংলাদেশে পাকহানাদারদের নারকীয় হত্যাকাণ্ড, বর্বরতা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অসহায় নিরন্ন মানুষের  আশাভঙ্গজনিত চিত্তবিক্ষোভের প্রচণ্ড অভিঘাতে সমাজ-মানসে যে সুগভীর আলোড়ন ও বিপর্যস্ত ভয়ঙ্কর চিত্তসংকটের জন্ম দিয়েছিল, তারই বেদনা গভীর ও রক্তাক্ত আলেখ্য হলো শামসুর রাহমানের এই কাব্য। তাঁর কবিতা হয়ে ওঠে মুক্তিকামী জাতির দুঃখ জয়ের নবীন মন্ত্র, নৈরাশ্য নাস্তির কবরখানায় নবজীবনের পিরামিড। সমকালীন সমাজ সংস্থায় বিরাজমান বাস্তবতাকে কাব্যিক ব্যঞ্জনায় প্রত্যক্ষগোচর করতে শামসুর রাহমানের কাব্যেও এই যুগযন্ত্রণার বাস্তব প্রতিফলন ও সময়কে সচেতনভাবে ধারণ প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়।

তাঁর ‘বন্দি শিবির থেকে’ শিরোনাম কবিতার প্রতিটি পঙ্‌ক্তিতে উচ্চারিত হয়েছে আগুনঝরা সময়ের ক্ষোভ ও বিদ্রোহ- 

বন্ধুরা তোমরা যারা কবি,
স্বাধীন দেশের কবি, তাদের সৌভাগ্যে
আমি বড় ঈর্ষান্বিত আজ।
যখন যা খুশি
মনের মতন শব্দ কী সহজে করো ব্যবহার
তোমরা সবাই।
যখন যে শব্দ চাও, এসে গেলে সাজাও পয়ারে,
কখনো অমিত্রাক্ষরে, ক্ষিপ্র মাত্রাবৃত্তে কখনো-বা।
সে সব কবিতাবলি, যেন রাজহাঁস,
দৃপ্ত ভঙ্গিমায় মানুষের
অত্যন্ত নিকটে যায়, কুড়ায় আদর।
                         (বন্দি শিবির থেকে)

স্বাধীন দেশের কবিরা মন চাইলেই লিখতে পারে ইচ্ছেমত কবিতা পয়ারে, কখনো অমিত্রাক্ষরে কিংবা ক্ষিপ্র  মাত্রাবৃত্তে সাজিয়ে। কিন্তু কবি পরাধীন দেশের যুদ্ধবিধ্বস্ত বন্দি শিবিরে থেকে কবিতা লিখতে পারেন না। তাঁকে পালিয়ে পালিয়ে লিখতে হয় যন্ত্রণাবিদ্ধ কবিতার আহত পঙ্‌ক্তিমালা। 

কবির  মন জিজ্ঞাসার দোলাচলতায় অনুরণিত হয় যেন তাঁর আজ কিছুই অবশিষ্ট নেই, তিনি যেন তৃষাতুর ধু-ধু পথপ্রান্তে পড়ে আছেন পরিত্যক্ত একা। যাকে মনে মনে প্রার্থনা করেন তাঁরও দেখা মেলে না। এমনকি দুঃসময়ে কবিতাও ফিরিয়ে নেয় দৃষ্টি। কোথাও যেন তিনি একচিলতে সান্ত্বনাও খুঁজে পান না। তিনি আবহকুক্কুট হয়ে গেছেন এবং প্রবল প্রলয়ে প্রকম্পিত। মানুষ যখন বিপদে পড়ে তখন তার সহায় যেন আস্তে আস্তে হারিয়ে যায় অর্থাৎ বিপদ যখন আসে তখন চারদিক দিয়ে আসে। তখন মানুষ এমন অসহায় হয়ে যায় যে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কবি তাঁর দার্শনিক বীক্ষণে সেই অসহায় নিঃসঙ্গ করুণ অবস্থার চিত্র বর্ণনা করেছেন দারুণ শৈল্পিক দক্ষতায়।

কী আছে আমার আজ? কিছু নেই শুধু
বিভারিক্ত ধু-ধু,
পথপ্রান্তে আছি পড়ে, পরিত্যক্ত একা;
প্রার্থিত জনের দেখা
মেলে না কখনো। এমনকি কবিতাও
নিয়েছে ফিরিয়ে দৃষ্টি। নেই যেন কোথাও
সান্ত্বনার অমল উদ্যান। আমি আজ
আবহকুক্কুট প্রায়, কম্পমান, বাতাস বড়ই জাঁহাবাজ।
                                                   (কিছুই নেই)

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে কবি নিজের গ্রামের বাড়ির পুকুর ঘাটে বসে একই সময়ে লেখেন দুটি কালজয়ী কবিতা। একটি হল ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ এবং অপরটি হল ‘স্বাধীনতা তুমি’। ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ কবিতায় কবির হৃদয়মথিত  উচ্চারণ ছড়িয়ে গেছে পৃথিবীর এপ্রান্ত থেকে অপ্রান্তে, পরিণত হয়েছে সকল মানুষের মিলিত কণ্ঠস্বরে। কবির মনে প্রশ্ন জাগে, স্বাধীনতাকে পাওয়ার জন্য আর কত রক্ত দিতে হবে, আর কত সইতে হবে খাণ্ডবদাহন। স্বাধীনতার জন্য পাড়ি দিতে হয়েছে অনেক রক্তের সমুদ্র, দিতে হয়েছে অনেক নিষ্পাপ জীবনের বলিদান। তবুও কবির দৃঢ় কণ্ঠে দীপ্ত শপথের উচ্চারণ-

পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত জ্বলন্ত
ঘোষণার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে,
নতুন নিশান উড়িয়ে, দামামা বাজিয়ে দিগ্বিদিক
এই বাংলায়
তোমাকে আসতেই হবে, হে স্বাধীনতা।
                 (তোমাকে পাওয়া জন্যে, হে স্বাধীনতা)

‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতাটিতে কবি স্বাধীনতাকে বর্ণনা করেছেন নানান রূপে। তুলনা করেছেন বিবিক্ত বিষয়ের সঙ্গে। পরাধীনতা যেমন একটা বন্দি শিবির যেখানে মুখ ফুটে বলা কিংবা লেখা যায় না মনের অব্যক্ত কথা, অন্যদিকে স্বাধীনতা যেন মনের রঙ তুলি দিয়ে আঁকা এক অপূর্ব জগত-‘যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা’।

স্বাধীনতা তুমি
খোকার গায়ের রঙিন কোর্তা,
খুকির অমন তুলতুলে গালে রৌদ্রের খেলা।
স্বাধীনতা তুমি
বাগানের ঘর, কোকিলের গান
বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা,
যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা।
                                  (স্বাধীনতা তুমি)

ব্যক্তি মানসের চিত্তমুকুরে প্রতিবিম্বিত নিরঞ্জন আলো-আঁধারের অপরিজ্ঞাত জগতের শাব্দিক অবগুণ্ঠনের প্রকাশ-ই কবিতা। কবি যখন তাঁর মনের কথা চিৎকার দিয়ে সবার সামনে বলতে পারেন না তখনই তাঁর সমস্ত ক্রোধ, আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না, প্রেম, বিরহ, মিলন কবিতায় প্রকাশিত হয়। যুদ্ধের সময় কবি ডায়েরিতে যেসব কবিতা লিখতেন সব কবিতা-ই লেখার পর লুকিয়ে রাখতেন। কবি তাঁর জবানিতে উল্লেখ করেছেন, “সন্ত্রাসের কাঁটাতারে বিদ্ধ আমি, জঙ্গী জীপের শব্দময় শহরের রুদ্ধবাক বাসিন্দা, গেরিলাদের হঠাৎ পদধ্বনিতে সচকিত, আশান্বিত এক শ্বাসজীবী কিছু কবিতার পঙ্ক্তি গচ্ছিত রাখতে শুরু করলাম ডায়েরির পাতায়। অত্যন্ত গোপনীয়তার মধ্যে চলছিলো আমার এই অভিযাত্রা। শুধু আমার স্ত্রী, দু-চারজন সুহৃদ এবং কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা জানতেন সে কথা। খানাতল্লাশীর মরশুমে, ধরপাকড়ের হিড়িকে এই ডায়েরিকেও গা ঢাকা দিতে হয়েছে বার বার।”

‘প্রবেশাধিকার নেই’ কবিতায় কবি স্বগতোক্তি করেছেন-

এখন আমার ক্রোধ দুঃখ
আনন্দ অথবা ভালোবাসা কবিতার ছদ্মবেশে
কেবলি লুকায়
দেরাজের একান্ত কোটরে
নিভৃত আলমারি কিংবা সুটকেসে। যেন
ওরা পার্টিকর্মী,
গোয়েন্দা এবং পুলিশের
চোখে ধুলো দিয়ে
আড়ালে থাকতে চায় ধড়পাকড়ের মরসুমে।
                              (প্রবেশাধিকার নেই)

কাব্যের পুরোটা কবিতা যেন কবির স্বগতোক্তি। কবিতা সম্পর্কে কবি ফজল শাহাবুদ্দীন বলেছিলেন, “কবিতা এক ধরনের স্বগতোক্তি...এক ধরনের ঘনিষ্ঠ উচ্চারণ...এক ধরনের স্বগত সংলাপ। ...একটি অন্তর্গত হাহাকারের মতো কেবলই ধ্বনিত হতে থাকে। তার সর্বসত্তায় তার সকল অস্থিমজ্জা জুড়ে। 
নদীর ভাঙনের মতো ক্রমাগত ধ্বস নামতে থাকে কবির রক্ত মাংসে, কবি অলৌকিক শক্তির খেলার মধ্যে কেমন করে যেন ডুবে যান। এবং অবগাহনের অতল থেকে তাকে আবিষ্কার করতে হয় তার কবিতার শরীর...কবিতার আত্মা। কবিতায় ধ্বনিত- প্রতিধ্বনিত চিরকালের সঙ্গীত।”

যুদ্ধে যখন রক্তাক্ত ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে সমগ্র দেশজুড়ে। তখন সকলকেই গোলাপের সাথে তুল্য প্রিয়জনের সঙ্গ পরিত্যাগ করতে হয়েছে স্বাধীনতার যুদ্ধের জন্য। কবি তাই প্রিয়জনের প্রতি প্রতিশ্রুতি করে বলেছেন-

আমাদের ক্ষত সেরে গেলে
কোনো এক বিনম্র বিকেলে
তোমার কাছেই যাবে হে আমার সবচেয়ে আপন গোলাপ,
করবো না কথার খেলাপ।
                        (প্রতিশ্রুতি)

চোখের সামনে খুন, ধর্ষণ, নারকীয় হত্যাযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেও কবি যেন মুখ ফুটে কিছুই বলতে পারেন না। সত্যের বলাৎকার আর অসত্যের মাথাচাড়া দিয়ে রাজত্ব করাও কবিকে সহ্য করতে হয়। পাকিস্তান হানাদারবাহিনীর বুটের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে বাংলা মায়ের অগণিত সন্তান। সেই রক্তস্রোতে ঝরেছে নাম না জানা অনেক মায়ের অশ্রু। এইসব দেখে কবি যেন নির্বাক হয়ে গেছেন।

 বড় আটপৌরে এ জীবন,
প্রশংসা অথবা নিন্দা কিছুই জোটে না
এ পোড়া কপালে।
সত্যের বলাৎকার দেখে, নিরপরাধের হত্যা
দেখেও কিছুতে মুখ পারি না খুলতে।
বুটের তলায় পিষ্ট সারাদেশ, বেয়নেটবিদ্ধ
যাচ্ছে বয়ে রক্তস্রোতে, কত যে মায়ের অশ্রুধারা।
                                             (প্রাত্যহিক)

যারা নিজেদের প্রিয়জনদের চোখের সামনে নির্মমভাবে হত্যা হতে দেখেছেন তারা কখনো হাসিতে কখনো কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছেন, প্রলাপ বকেছেন মনে মনে। কবি তাদের প্রতি উদ্দেশ্য করে বলেছেন, তাদের যদি জিজ্ঞেস করা হয় তাদের অভিব্যক্তির কথা তাহলে তারা সবাই আর্তকণ্ঠে প্রতিবাদের ঝড় তুলে সমস্বরে বলে উঠবে- যুদ্ধই উদ্ধার। এই কাব্যের প্রতিটি কবিতায় একজন বিপ্লবী কবিকে আবিষ্কার করতে মোটেও বেগ পেতে হয় না।

বাঙালি শবের স্তূপ দেখে দেখে যিনি
বিড়বিড় করছেন সারাক্ষণ, কখনো হাসিতে
কখনো কান্নায় পড়ছেন ভেঙে- তাকে
জিজ্ঞেস করুন,
দগ্ধ, স্তব্ধ পাড়ার নিঃসঙ্গ যে ছেলেটা
বুলেটের ঝড়ে
জননীকে হারিয়ে সম্প্রতি খাপছাড়া
ঘোরে ইতস্তত, তাকে জিজ্ঞেস করুন,
হায়, শান্তিপ্রিয় ভদ্রজন,
এখন বলবে তারা সমস্বরে, যুদ্ধই উদ্ধার।
                                       (উদ্ধার)

‘দখলি স্বত্ব’ কবিতাটিতে পরাবাস্তবতার গভীর চিত্র দৃশ্যত হয়। কবির দখলি স্বত্ব জুড়ে বসে আছেন কেউ না কেউ। সেই দখলি স্বত্ব ব্যক্তিজগত ছাড়িয়ে বস্তুজগতের দিকে গতায়ত।  ইহলোক থেকে পরলোকের দিকে ইঙ্গিত করেছে। একাত্তরের সময় অনেকেই অন্যের বাড়িঘর লুটপাট করেছে, দখল করে নিয়েছে অন্যের সম্পত্তি। ফিরে এসে অনেকেই ফিরে পায়নি তার সম্পত্তি কিংবা এজগতে দেহাবসনের মাধ্যমে কবরে গিয়েও ঠিকানা পাবে কিনা কবি সন্দিগ্ধ। তাই কবি আপন মনে আউড়ে গেছেন আপ্তবাক্য- 

সেই ঘর ছেড়ে অন্য কোনো ঘরে-
হোক তা যতই চোখ-ধাঁধানো, আয়েশী-
কখনো করব বসবাস, কিছুতেই
পারি না ভাবতে
অথচ আমার
বাড়ির দখলি স্বত্ব হারিয়ে ফেলেছি।
সব ক’টি ঘর জুড়ে বসে আছে দেখি
বিষম অচেনা এক লোক-
পরনে পোশাক খাকি, হাতে কারবাইন।
                                   (দখলি স্বত্ব)

কবি একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক। তিনি এ মাটির মায়া ত্যাগ করে অন্য কোথাও যেতে চান না। যদি দেশের জন্য এবং দেশের মানুষের জন্য মরতেও হয় তবুও তিনি প্রস্তুত আছেন। কোন কিছুর বিনিময়ে ছেড়ে যেতে চান না সেই সব মানুষকে, যাদের দিনরাত্রি বাজেয়াপ্ত হয়েছে এবং প্রতিনিয়ত যন্ত্রণা উপেক্ষা করে সকল সময় মৃত্যুর প্রতীক্ষা করা যাদের নিয়তি।  

তবু আমি যাব না কখনো
অন্য কোনোখানে
থাকব তাদের সঙ্গে এখানেই, বাজেয়াপ্ত হয়েছে যাদের
দিনরাত্রি, যন্ত্রণায় বিদ্ধ হয়ে সকল সময় সারিবদ্ধ
মৃত্যুর প্রতীক্ষা করা যাদের নিয়তি।
                              (না আমি যাব না)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধু দা’র মধুর ক্যান্টিনের স্মৃতি নিয়ে লেখা ‘মধুস্মৃতি’ কবিতাটি। এই মধুর ক্যান্টিন ছিল এক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আন্দোলনের পরিকল্পনা করার অন্যতম স্থান। সেই ৫২ থেকে ৭১, অনেক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে মধুর ক্যান্টিন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন এবং যে কোন গণআন্দোলনের সাক্ষী ছিল মধুর ক্যান্টিন।

বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদ অথবা বাঙালি মানসের বিবর্তন
উঠত ঝলমলিয়ে দিব্যি তার্কিকের
জাগর মনস্বিতায়। কখনো আবার
সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতা ইত্যাদি শব্দের
কোলাহলে প্রবল উঠত কেঁপে শেড।
কখনোবা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে, গণ-আন্দোলনে
থরথর শহুরে রাস্তায়
কি আশ্চর্য, যেত উড়ে আপনার অলৌকিক মধুর ক্যান্টিন।
                                                         (মধুস্মৃতি) 

কবির ‘তুমি বলেছিলে’ কবিতাটির রোমান্টিকতা মিশে গেছে চরম বিদ্রোহে। চারদিক যখন আগুনে দাউদাউ করে জ্বলছে শহর থেকে গ্রাম, রাস্তায় টহল দিচ্ছে হানাদার জঙ্গি জীপ সেইসাথে শিলাবৃষ্টির মত অবিরাম গুলি বর্ষণ হচ্ছে তখন কবি যেন বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। 

অদূরে গুলির শব্দ, রাস্তা চষে জঙ্গি জিপ। আর্ত
শব্দ সবখানে। আমাদের দুজনের
মুখে আগুনের খরতাপ। আলিঙ্গনে থরথর
তুমি বলেছিলে,
‘আমাকে বাঁচাও এই বর্বর আগুন থেকে, আমাকে বাঁচাও
আমাকে লুকিয়ে ফেল চোখের পাতায়
বুকের অতলে কিংবা একান্ত পাঁজরে,
শুষে নাও নিমেষে আমাকে
চুম্বনে চুম্বনে।

দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে ঐ নয়াবাজার,
আমাদের চৌদিকে আগুন,
গুলির ইস্পাতি শিলাবৃষ্টি অবিরাম।
তুমি বলেছিলে,
‘আমাকে বাঁচাও।’
অসহায় আমি তা-ও বলতে পারিনি।
                                (তুমি বলেছিলে)

১৯৭১ সালের মার্চে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে মুনীর চৌধুরী ফিরে আসার কিছুদিন পরেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। তাঁর কিশোর ছেলে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে চলে যায়। এসময় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আদেশে মে-জুন মাসে ইংরেজি বিভাগের প্রধান হিসেবে এবং জুলাই মাস থেকে তিনি কলা অনুষদের ডীন হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর মুনীর চৌধুরীকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীদের সহযোগী আল-বদর বাহিনী তাঁর বাবার বাড়ি থেকে অপহরণ করে ও সম্ভবত ঐদিনই তাঁকে হত্যা করে। বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করে দিতে পাকিস্থানী হানাদারবাহিনীর নীল নকশায় সেদিন প্রখ্যাত সাহিত্যিক, নাট্যকার, ভাষাবিদ ও শিক্ষাবিদ মুনির চৌধুরীসহ অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়। সেই থেকে ১৪ ডিসেম্বর ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। মনির চৌধুরীর চলে যাওয়া অপরিমাণ ক্ষত শূন্য করেছে কবি শামসুর রাহমানের মনে এবং সমগ্র দেশে। তাই কবি ব্যথিত স্বরে উচ্চারণ করেন-

শুনুন মুনীর ভাই, খবর শুনুন বলে আজ
ছুটে যাই দিগ্বিদিক, কিন্তু, কই কোথাও দেখি না আপনাকে।
খুঁজছি ডাইনে বাঁয়ে, তন্ন তন্ন, সবদিকে, ডাকি
প্রাণপণে বার-বার। কোথাও আপনি নেই আর।

আপনি নিজেই আজ কী দুঃসহ বিষণ্ণ সংবাদ।
                                     (রক্তাক্ত প্রান্তরে)

যুদ্ধে পক্ষ-বিপক্ষ থাকে আজীবন। কিন্তু একজন মানুষের মৃত্যুর পর তার মৃত শরীর নিয়ে চলে ব্যবসা আর জঘন্য আন্দোলন। একদল এসে বলে এই লাশ আমাদের দলের লোকের আরেক দল এসে দাবী করে তাদের দলের বলে। মানুষের মনুষ্যত্বহীনতার চর্চার ইতিহাস অনেক পুরনো। তাই কবি চিন্তিত তাঁর মৃত্যুর পর তিনি কোন দলে থাকবেন। তাই সঙ্গত কারণেই বলেন- 

যুদ্ধে পক্ষ-বিপক্ষ থাকেই চিরকাল।
অথচ বুঝি না কিছুতেই
আমার মৃত্যুর পরে ফের
কোন দলে থাকব এই গুলিবিদ্ধ আমি?
                          (জনৈক পাঠান সৈনিক)

কবিরা সমকালে বেড়ে ওঠেন, বিচরণ করেন সর্বকালে। তাই সমকালীন সমস্যা, সংকটসহ যাবতীয় বিষয় তাঁদের কবিতায় ঘুরে ফিরে আসে। কবিতা ব্যক্তিক মানুষের শুদ্ধ মননচেতনার বাস্তব প্রতিফলন।  তাই একজন কবি সময়কে উপেক্ষা করতে পারেন না। কবি শামসুর রাহমানও তাঁর ব্যতিক্রম নয়। যুদ্ধকালীন সময়ে তাঁর কবিতাও হয়ে উঠেছে আগুনের জ্বলন্ত শলাকা। তাঁর কবিতার প্রতিটি অক্ষরে ফুটে উঠেছে যুদ্ধের ভয়াবহতার বর্ণনা ও দেশব্যাপী একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্নে পতাকার আন্দোলন। তাই তাঁর কবিতায় ধ্বনিত হয়েছে সেই সমকালীন বাস্তবতার বিদ্রোহী স্বর-

এখন আমার কবিতার
প্রতিটি অক্ষরে
বনবাদাড়ের গন্ধে, গেরিলার নিঃশ্বাস এবং
চরাচরব্যাপী পতাকার আন্দোলন।
                             (প্রতিটি অক্ষরে)

যুদ্ধের সময় অনেকেই শরণার্থী হয়ে চলে গেছেন দেশ ছেড়ে। আর যারা দেশে ছিলেন তারাও যেন নিজ দেশে পরবাসী। কবি দেশ থেকেও হয়েছেন উদ্বাস্তু। তাঁর ক্লান্ত মনে ধরেছে বিষণ্ণতার ঘুণ।  তাঁর ‘উদ্বাস্তু’ কবিতা সেই সুরেরই প্রতিসুর-

যদিও যাইনি পরবাসে, তবু আমি
বিষণ্ণ উদ্বাস্তু একজন। ক্লান্ত মনে ধরে ঘুণ, শুধু ঘুণ।
                                                   (উদ্বাস্তু)

ইয়াহিয়া  খান ১৯৬৯ হতে ১৯৭২ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ও সামরিক শাসক ছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর আদেশেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানে হত্যাযজ্ঞ চালায়। বিদেশী প্রতিনিধিবর্গের প্রতি কটাক্ষ করে কবি বলেছেন-

ইত্যাদি স্লোগানে হবে সচকিত সুসজ্জিত মঞ্চ।
বক্তৃতামালায় গানে যাবে ভেসে রাতের মালঞ্চ।
আপনারা এলে পথে ঘাটে নামাতে হবে না আর
লাল গালিচার ঢল। ইয়াহিয়া, নব্য অবতার
হিটলারের, আগেই রেখেছে মুড়ে বড় ক্ষিপ্রতায়
কী এলাহি কাণ্ড, সারা বাংলাদেশ রক্ত গালিচায়!
                                           (সংবর্ধনা)

বাংলাদেশের কবিতায় প্রেম ও রাজনীতি, বিষয় দুটো বেশি উচ্চারিত হয়েছে। এই দুটো মৌলিক প্রধাবনা (মার্ক্স ও ফ্রয়েড সাক্ষী) মানুষের জীবনের সাথে অবিচ্ছেদ্য। তবে শামসুর রাহমান প্রেমের ভেতর দিয়েই রাজনীতি ও সমাজ বাস্তবতাকে প্রত্যক্ষ করেছেন সচেতনতার দিদৃক্ষায়। তাঁর কবিতায় উচ্চারিত হয়েছে প্রচণ্ড জীবনবোধ ও জীবনবাদী কবি হিসেবে অসহায় মানুষের কথা। কবিরা  সমষ্টিগত মানুষের প্রতিনিধি, সমাজের মানুষ হিসেবে দেশের ও জাতির গোষ্ঠীভাবনার অংশীদার। সমাজের সমকালীন সংকট বিশেষভাব প্রকাশের মাধ্যম হয়ে ওঠে একজন সমাজ সচেতন কবির। শামসুর রাহমান সেই সুরকেই বেগবান করেছেন তাঁর কবিতার নান্দনিক শিল্পশৈলী সৃষ্টিতে।





















মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাশিয়ার কবিতা

তোমার জন্য রজনীগন্ধা দিন

জার্মানির কবিতা