নক্ষত্রের গল্প

                                    উৎসর্গঃ বন্ধুবরেষু প্রিতম গোর্কিকে।

দশ দিগন্ত পাড়ি দিয়ে উদভ্রান্তের মত আমরা তিন বন্ধু
রোজ হাজির হতাম পাহাড় কেটে তৈরি করা আকাশবাড়ির একটা টং চায়ের দোকানে
কমলেশ বাগচী এবং যতীন দস্তিদার আমার চেয়ে বয়সে বড়
আমাদের চা কাপে থাকতেই নিমিষে বয়েস বেড়ে যেত নক্ষত্রের
 
কার্ল মার্কস, লেলিন, চে গুয়েভারা, মাও সে তুং, মাস্টার দা, প্রীতিলতা ওয়াদেদ্দার
 
দিন দিন আমাদের সমগোত্রের হতে লাগলো
কমলেশ বাগচী রোজ চায়ের সাথে রাজনীতির মাথা চিবিয়ে খেতো
যতীন দস্তিদার সিগারেটের ধুঁয়া তুলে গম্ভীর হয়ে
 
সেদিন আমাকে বলেছিল, জানিস, আরতি মাসীর একমাত্র মেয়েটা 
বিনা চিকিৎসায় মারা গেলো!
আমি খবর পেয়ে ছুটে যাই
আরতি মাসি আমার দিকে
 
অবাক নির্লিপ্ত চোখে নির্বিকার চেয়ে ছিল
 
এরকম নির্লিপ্ত চোখ আমি কোনদিন কারো দেখিনি!
মানুষের অধিকারের কথা বলতো যতীন দস্তিদার 
এইতো সেদিন সন্ধ্যার মুখে বাড়ি ফিরছিল যতীন
রথতলার মোড়ে আসতেই
 
মুখোশ পরা কিছু লোক এসে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিল যতীনের হৃদপিন্ড
যতীন দস্তিদার! 
আমার বন্ধু,
 
যে একদিন অধিকারের কথা বলেছিল!
এরপর কমলেশ বাগচী এবং আমি ক্রমশ আগুনের মত জ্বলে উঠতে থাকি 
মৃত্যু খেয়ে বেঁচে থাক যতীন দস্তিদার!
 
আমরা বেঁচে থাকি জাগতিক ঈশ্বরের ক্ষত নিয়ে
একদিন সম্মুখ যুদ্ধে আমার একটি পা হারায়
কমলেশ বাগচী ধরা পড়ে
 
ওকে 'রাজদ্রোহী' ঘোষণা করা হয়
 
তারপর কোর্টের রায়ে ওর ফাঁসির আদেশ হয়
রায়ের পর কোর্টের মোড়ে ওর সাথে আমার চোখাচোখি হয়
 
ওর চোখে আমি প্রচণ্ড বিদ্রোহ আর মুখে হাসি দেখি
 
ও বজ্র মুঠি করে অস্ফুটে বলেছিল 'লাল সালাম'
আমি দাঁতে দাঁত চেপে বলেছিলাম, দেখিস কমলেশ, মুক্তি একদিন আসবেই।
 
যেদিন আমরা কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে পারবো
 
আমি মানুষ!
 
যতীন দস্তিদার এবং কমলেশ বাগচীও আমাদের মত মানুষ!
 
আরতি মাসী এবং তথাকথিত ঈশ্বরও আমাদের সমপর্যায়ের।
এবং আমরা সবাই মানুষ!
বিপ্লবে বিদ্রোহে কিছু নক্ষত্র অমর হয়ে যায় 
যতীন দস্তিদার এবং কমলেশ বাগচী
 
আমার চোখে পৃথিবী দেখে
 
শ্বাস নেয় বেঁচে থাকে
বেড়ে ওঠে আমার ভেতরে বিদিক সৈনিক হয়ে
 
আর আমি আজানের আওয়াজ শুনলে ধ্যানস্থ পায়ে আল্লাহর দিকে ছুটে যাই!
তারিখঃ ৯ জানুয়ারি, ২০১৭ খ্রি.



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাশিয়ার কবিতা

তোমার জন্য রজনীগন্ধা দিন

জার্মানির কবিতা