একজন কবি ও একটি কবিতাঃ আলোচনা- ড. অনিরুদ্ধ বসু
আফ্রোদিতিঃ রুবেল পারভেজ
কবি রুবেল পারভেজ এর 'আফ্রোদিতি' কবিতাটির আমি বিশ্লেষণ করছি।আমার উদ্দেশ্য এই কবিতাটির বিশ্লেষণ
প্রসঙ্গে রুবেল পারভেজের কবিতা সম্বন্ধে কয়েকটি কথা বলা।কবিতাটি আমি তুলে দিচ্ছিঃ
আফ্রোদিতি
চোখ খোলা নদী বুকে
শোক সয়ে শুয়ে থাকে জীপসী জীবন
স্বামীহীন সীতা হয়ে গীতা পড়ে
শুদ্ধ হয় মিতা আমার
জামার ভাঁজে ভাঁজে দুঃখরা হয়ে গেছে নমরুদ
জমদূত ডেকে যায় রোজ রাতে
তাতে কিছু আসে যায় না
ফেরুপালের মত অকস্মাৎ
ফিরে আসে বুমেরাং ভালোবাসা
ফেনিল সফেন আফ্রোদিতি
প্রেম আমার!
তোমাকে ভালোবেসে সহসাই বনে যাই অতিমানব অ্যারিস
ঘোর কাঁটতেই নিজেকে অ্যাডোনিস মনে হয়
ব্ল্যাক আউটের মায়াবী জোছনায় চিরকাল
ভালোবাসা বন্দী হৃদয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে
ভাবনার পুলসিরাত পার হয়ে
অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকি
প্রান্তরের ওপারে আলোক, আঁধার নাকি শূন্য?
বিবিক্ত চেতনায় দিশেহারা মন
চারিদিকে স্থবিরতা নেমে আসে
দুই জোড়া চোখ হিম হয়ে যায় তৃষিত কামনায়
তবু পৃথিবীর শাঁস খেয়ে বেঁচে থাকি
আমি আর আফ্রোদিতি।
শোক সয়ে শুয়ে থাকে জীপসী জীবন
স্বামীহীন সীতা হয়ে গীতা পড়ে
শুদ্ধ হয় মিতা আমার
জামার ভাঁজে ভাঁজে দুঃখরা হয়ে গেছে নমরুদ
জমদূত ডেকে যায় রোজ রাতে
তাতে কিছু আসে যায় না
ফেরুপালের মত অকস্মাৎ
ফিরে আসে বুমেরাং ভালোবাসা
ফেনিল সফেন আফ্রোদিতি
প্রেম আমার!
তোমাকে ভালোবেসে সহসাই বনে যাই অতিমানব অ্যারিস
ঘোর কাঁটতেই নিজেকে অ্যাডোনিস মনে হয়
ব্ল্যাক আউটের মায়াবী জোছনায় চিরকাল
ভালোবাসা বন্দী হৃদয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে
ভাবনার পুলসিরাত পার হয়ে
অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকি
প্রান্তরের ওপারে আলোক, আঁধার নাকি শূন্য?
বিবিক্ত চেতনায় দিশেহারা মন
চারিদিকে স্থবিরতা নেমে আসে
দুই জোড়া চোখ হিম হয়ে যায় তৃষিত কামনায়
তবু পৃথিবীর শাঁস খেয়ে বেঁচে থাকি
আমি আর আফ্রোদিতি।
আফ্রোদিতি গ্রিক পুরানের প্রেম,আনন্দ,আবেগ ও সৌন্দর্যের দেবী। রোমান পুরাণে
আফ্রোদিতির প্রতিষঙ্গী চরিত্র ভেনাস। হেসিওডের থিওগোনি অনুসারে আফ্রোদিতির জন্ম
সমুদ্রের ফেনা থেকে। গ্রীক মিথোলজিতে জিউসের পর সবচেয়ে বর্ণিল অলিম্পিয়ান হচ্ছে
আফ্রোদিতি। দেবতা থেকে শুরু করে মানুষ,সবাইকেই তিনি
বিমোহিত করেছেন তার রহস্যময় চরিত্র দিয়ে। আফ্রোদিতি ভালোবাসতেন অ্যারিসকে, কিন্তু তাকে জোর করে হেফাস্টাস এর সাথে বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের পরও
আফ্রোদিতি অ্যারিসের সাথে পরকীয়া প্রেমে লিপ্ত হলে হেফাস্টাস দেখে ফেলে এবং পরে
একসময় তাকে ত্যাগ করে। আবার মিথে দেখা যায়, ট্রয়ের
যুদ্ধের সময় আফ্রোদিতি অ্যারিসের স্ত্রী ছিলেন। এতসব ঘটনার পরেও আফ্রোদিতি
অ্যাডোনিস নামের এক মানবের প্রেমে পড়েন।
এবার কবিতাটি বিশ্লেষণ করা যাক।
'চোখ খোলা নদী বুকে/শোক সয়ে শুয়ে থাকে জীপসী জীবন',চোখ খোলা নদী বলতে প্রমত্তা ভরা যৌবনা নদীকে বোঝানো হয়েছে। 'শোক সয়ে শুয়ে থাকে জীপসী জীবন' মানে নদীর পাড়ে
অসংখ্য জীপসী বা যাযাবর মানুষ কষ্ট সহ্য করে ও বসবাস করে। ' স্বামীহীন সীতা হয়ে গীতা পড়ে/ শুদ্ধ হয় মিতা আমার' সীতা রামায়ণেরর একটি চরিত্র,এখানে স্বামীহীন
সীতা বলতে কবির কাল্পনিক মানসী প্রতিমা আফ্রোদিতির কথা বলা হয়েছে।
আফ্রোদিতির স্বামী হেফাস্টাস যখন তাকে ত্যাগ করে তখন সে
কিছুটা হলেও শুদ্ধ হয়ে যায়। আর গীতা হিন্দুদের ধর্মীয় গ্রন্থ। গীতার মর্মবাণী যদি
কেউ হৃদয়ে ধারণ করে তবে সে একদিন শুদ্ধ হবেই। তাই কবিতার চরণ দুটি যথার্থ। 'জামার ভাঁজে ভাঁজে দুঃখরা হয়ে গেছে নমরুদ' এখানে
নমরুদ ইসলামী মিথোলজির একটি চরিত্র। নমরুদ ছিল হৃদয়হীন সে নিজেকে খোদা দাবী
করেছিল। তাই'দুঃখরা হয়ে গেছে নমরুদ' মানে পাষাণ হয়ে গেছে। কবিকে দুঃখ আর স্পর্শ করতে পারে না। 'দুঃখরা হয়ে গেছে নমরুদ' এই কথাটুকু বাংলা
কবিতার নতুন সৃষ্টি। এ রকম আগে কোথাও পাওয়া যায় নি।
'জমদূত
ডেকে যায় রোজ রাতে/ তাতে কিছু আসে যায় না',বাঁচার
স্বপ্নের বিপরীতেই মৃত্যুর হাতছানি। জমদূত কবিকে মৃত্যুর ডাক দিলেও তিনি ভালোবাসার
শক্তিতে সবকিছু তুচ্ছ মনে করেন। 'ফেরুপালের মত অকস্মাৎ/
ফিরে আসে বুমেরাং ভালোবাসা' একানে ফেরুপাল বলতে ফেরেশতাকে
বোঝানো হয়েছে। মাঝে মাঝে ফেরেশতারা পৃথিবীতে হঠাৎ করেই নেমে আসে।
'ফিরে আসে বুমেরাং ভালোবাসা', বুমেরাং হলো
একখণ্ড বক্রাকৃতির কাঠ,যা অস্ত্র হিসেবে বা খেলার জন্য
ব্যবহৃত হয়। এটি সঠিক পদ্ধতিতে নিক্ষেপ করা হলে উপবৃত্তাকার পথে প্রদক্ষিণ করে
নিক্ষেপকারীর কাছেই ফিরে আসে। হেফাস্টাস আফ্রোদিতিকে ত্যাগ করার পর পুরাতন প্রেমিক
অ্যারিসের কাছেই ফিরে আসে।
'ফেনিল সফেন অাফ্রোদিতি /প্রেম
আমার! ' অর্থাৎ সমুদ্রের ফেনা থেকেই অাফ্রোদিতির জন্ম। 'তোমাকে ভালোবেসে সহসাই বনে যাই অতিমানব অ্যারিস/ঘোর কাঁটতেই নিজেকে
অ্যাডোনিস মনে হয়। প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি প্রথমেই অ্যারিসকে ভালোবাসতো, সর্বশেষে সে অ্যাডোনিস নামের এক মানবের প্রেমে পড়েন। কবি নিজেকে
স্বপ্নের মধ্যে অ্যারিস আর বাস্তবে অ্যাডোনিস মনে করেন। অর্থাৎ তিনি ভালোবাসার সঙ্গ
ছাড়তে চান না।
'ব্ল্যাক আউটের মায়াবী জোছনায়
চিরকাল/ভালোবাসা বন্দী হৃদয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ' ব্ল্যাক
আউট বলতে শোকের দিনে বা প্রতিবাদের জন্য সবকিছু কালো করে রাখা বা অন্ধকার করে
রাখা। জোছনা আলোর প্রতীক আর ব্ল্যাক আউট অন্ধকারের। তাই এখানে জোছনার বদলে আঁধার
দিলে ভালো হত। তবে এখানে ব্ল্যাক আউট শব্দটি দুরন্তপনার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত
হয়েছে। কারণ ভালোবাসা আলোকিত বা জোছনাময়ী। তাই ভালোবাসার জন্য জোছনা শব্দটির
প্রয়োগ সঠিক। এখানে তাই ব্ল্যাক আউট শব্দটি আভিধানিক অর্থ বহন করেনা প্রতীকী অর্থ
বহন করে। আর ভালোবাসা চিরকাল হৃদয়কে ঘিরেই আবর্তিত হয়।
'ভাবনার
পুলসিরাত পার হয়ে / অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকি/ প্রান্তরের ওপারে আলোক,আঁধার নাকি শূন্য?' ইসলাম ধর্মে আছে পরজন্মে
মানুষকে পুলসিরাত পার হতে হবে। যে সৎ কর্ম করবে সে পুলসিরাত পার হতে পারবে আর যে
অসৎ সে পারবে না। কবি ভাবনার পুলসিরাত পার হয়ে অবাক হয়ে দেখেন প্রান্তরের ওপারে
মানে পরকালে কথা ভেবে নিজেকে প্রশ্ন করেন, ' প্রান্তরের
ওপারে আলোক,আঁধার নাকি শূন্য? 'এখানে
অসাধারণ এক দর্শন তুলে ধরেছেন কবি। ড. আল্লামা ইকবাল বলেছেন,মৃত্যুর পরে চির আলোকময়। অর্থাৎ মৃত্যুর পরের জীবন আলোকিত। স্মর্তব্য যে,ফারসী ফিলোসফি না জানলে এই কথাটি কোন কবির জানার কথা না। বার্গেজ
বলেছেন,মৃত্যুর পরে চির অন্ধকার। আর সোপেনহাওয়ার বলেছেন,মৃত্যুর পর চির অন্ধকার। অর্থাৎ মানুষ মরে গেলে মাটি চাপা দিলে বা
চিতার আগুনে পুড়ালেই সব শেষ। তারপর আর কিছু নেই। অসাধারণ এক বোধি দর্শন কবি তুলে
ধরেছেন তার কবিতায়। 'বিবিক্ত চেতনায় দিশেহারা মন' অর্থাৎ এত দর্শনের মাঝে কবি দিশেহারা।
'চারিদিকে
স্থবিরতা নেমে আসে/দুই জোড়া চোখ হিম হয়ে যায় তৃষিত কামনায়', নিরব নিথর একটা ভাব বিরাজ করে চারিদিকে। প্রবল প্রেমের জৈবিক কামনায়
কবি আর কবির প্রেমিকার চার চোখ হিম মানে অবশ হয়ে আসে। 'তবু
পৃথিবীর শাঁস খেয়ে বেঁচে থাকি/ আমি আর আফ্রোদিতি', ইসলাম
ধর্মে আছে,দুনিয়া আখিরাতের শস্য ক্ষেত্র। আর শস্যেরই শাঁস
থাকে। অর্থাৎ কবি পৃথিবীর যাবতীয় জৈবিক অজৈবিক ভোগ বিলাসে মত্ত থাকতে চান মানসী
আফ্রোদিতিকে নিয়ে।
কবি মৃত্যু,ইহকাল,পরকাল সবকিছুর ভেতর দিয়ে তার প্রেমকে প্রত্যক্ষ করেছেন একজন দার্শনিক
কবির চোখে।কবিতাটির ভেতর প্রচণ্ড দর্শন আছে।আমি পৃথিবীর অনেক দেশে ঘুরেছি,অনেক দেশের কবিতা আমি পড়ি,গবেষণা করি। কবি
রুবেল পারভেজের 'আফ্রোদিতি' কবিতাটি
পড়ে আমি অবাক হয়েছি। এ কবিতা সম্পর্কে আর কিছু বলার নেই শুধু বলব, আশ্চর্য একটি কবিতা!

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন