প্রবন্ধ
বহুমাত্রিক লেখক মুকুল রায়
“...বাগেশ্বরী পাহাড় লিখতে গিয়ে আমার পুনর্জন্ম হল! আমি যেন সেখানে ফেলে আসা আমার হারানো সোনাঝরা সেই বর্ণালী দিনগুলোকে আবার কুড়িয়ে পেলাম! সেই সাথে যেন আবারও ফিরে পেলাম অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া আমার সেই প্রিয় সেজদি, সেজ জামাইবাবুসহ না ফেরার দেশে চলে যাওয়া আসামের সেই প্রিয় মুখগুলোকে, যারা একদিন আমাকে করে নিয়েছিল তাদের আপনজন করে; তাদের সাথে আবারও যেন উপভোগ করে এলাম সেই আনন্দঘন দিনগুলোকে! ফিরে পেলাম সেই সময়কে, সেই মুহূর্তকে, সেই মায়াময় অনুভূতিকে! কত যুগ পরে, আবারও আমি তাদের সাথে মিশলাম, আনন্দে ভাসলাম, আপ্লুত হলাম, কাঁদলাম! আর আমার এ জীবনকে ছাপিয়ে গেল অন্য আর এক জীবন! ধন্য আমি, আমার এমন একটি জীবন ছিল!”
‘বাগেশ্বরী পাহাড়’ ভ্রমণোপন্যাসে বঙাঁইগাঁও ও আসামের বোহেমিয়ান জিপসি মানুষগুলোর ভাগ্যের সন্ধানে নিয়ত ছুটে চলা, তাদের যাপিত জীবনের সমুহ যন্ত্রণা, প্রেম, বিরম, হাসি-কান্না, পাওয়া না পাওয়ার গল্প অপূর্ব লালিত্যে বর্ণনা করেছেন কথাসাহিত্যিক মুকুল রায়।
‘বাগেশ্বরী পাহাড়’ থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করছিঃ
“হাঁটতে হাঁটতে পিছনের সম্মিলিত হাসির কলতান আর কথার কলরব শুনতে শুনতে আমি অনুভব করি, বঙাঁইগাঁওয়ের এই কলোনিতে বসবাসকারী দেশভাগের ফলে শেকড়চ্যুত বাস্তুচ্যুত পূর্ব বাংলার অভাগা বাঙালী, ভারতের অন্যান্য প্রদেশ থেকে আসা ভাগ্যান্বেষী অবাঙালী আর আসামের গ্রাম থেকে উঠে আসা সহজ-সরল অসমীয়া মানুষগুলো তাদের ভিন্ন-ভাষা, ভিন্ন-সংস্কৃতি, ভিন্ন-ধারার জীবন-যাপন আচার-আচরণ নিয়েও এক আন্তরিক সৌহার্দ্যে যুগযুগ ধরে একত্রে বসবাস করে আসছে, আর তাদের নিত্যদিনের ছোট ছোট এইসব হাসি-ঠাট্টা, আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ শেকড়হীন এই মানুষগুলোর মধ্যে ক্রমশঃ এক নতুন শেকড়ের জন্ম দিচ্ছে, জন্ম হচ্ছে নতুন এক সংস্কৃতির... যে সংস্কৃতি ধর্মীয়, জাতিগত, সম্প্রদায়গত, ভাষাগত ও প্রাদেশিকতার হিংসা-ঘৃণা-বিদ্বেষ-বিভেদ ভুলে সকলকে নিয়ে বেঁচে থাকার নতুন স্বপ্ন দেখায়...।”
‘বাগেশ্বরী পাহাড়’ ভ্রমণোপন্যাস সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত মন্তব্য করেছেন কবি মুহাম্মদ নুরুল হুদাঃ
“শেকড়হীন এই মানুষগুলোর বেঁচে থাকার তাগিদে একে অন্যের সহমর্মী হয়ে উঠেছে। তাদের ভেতর ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক বা জাতিগত কোন দ্বন্দ্ব নেই। জীবনের তাগিদে জীবন এবং মানুষকে ভালোবেসে তারা গড়ে তুলেছে ভালোবাসার এক নতুন পৃথিবী। মুকুল রায়ের পাঠক নন্দিত এই ‘বাগেশ্বরী পাহাড়’ ভ্রমণোপন্যাসটির পাঠক প্রিয়তা কালজয়ী হবে বলে আমার বিশ্বাস।”
ড. সরিফা সালোয়া ডিনা 'বাগেশ্বরী পাহাড় : বঙ্গাইগাঁও দর্শনকথা' শীর্ষক প্রবন্ধে বাগেশ্বরী পাহাড়ের নান্দনিক আলোচনা করেছেন। সেটির কিছু অংশ উল্লেখ করছিঃ
“...‘বাগেশ্বরী পাহাড়’-এর উল্লেখযোগ্য অংশ হলো, ভারতের সেভেন-সিস্টার-এর এক সিস্টার আসাম ও রংপুরের নাম ও অঞ্চলভিত্তিক পরিচিতি প্রদান। অসমিয়া বা অ্যাসামিজ ভাষায় আসামকে "অহোম" বলা হয়। "ব্রক্ষ্মপুত্র নদের উপত্যকা ও বরাক উপত্যকা এই দুই উপত্যকাসহ কাছাড় ও কার্বি আংলাং-এর পার্বত্য এলাকা নিয়ে ভোট-চিন-তিব্বতি-মঙ্গোলিয় সম্মিলনে এক বিচিত্র জনগোষ্ঠীর আবাসভূমি এই পাহাড়ঘেরা রাজ্য আসাম, বাংলাদেশের উত্তপূর্বের রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট - এই তিন বৃহত্তর জেলার প্রতিবেশী...."।
এদের মধ্যে বৃহত্তর রংপুরের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক আসামের। কারণ, ইতিহাসখ্যাত "প্রাগজ্যোতিষপুর" রাজ্য, পরবর্তীকালে "কামরুপ" এবং আরও পরে " কামতাবিহার" বা "কামতাপুর" নামে পরিচিতি লাভ করে। আর, ঐতিহাসিকভাবেই "রঙ্গপুর" বা "রংপুর" প্রাগজ্যোতিষপুরের অন্তর্গত ছিল।”
একজন কথাসাহিত্যিক হিসেবে তিনি যেমন পরিচয় দিয়েছেন অসাধারণ মুন্সিয়ানার তেমনি কাব্যসাহিত্যে তার কিছু ব্যত্যয় ঘটেনি। এ পর্যন্ত তাঁর পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
সমকালীন জীবন চেতনায় মুকুল রায়ের হাতেখড়ির কাব্যগ্রন্থ ‘জীবন সংক্রান্ত শব্দ’। কবিতা শঙ্খনীল শব্দের কারুকাজ এবং একটি শিল্পিত বোধের খোলা বাতায়ন। এই খোলা বাতায়নে কবির মানসপটে ভেসে ওঠে বাঙময় ঢেউয়ের অস্থির প্রকাশ ইচ্ছা। প্রকাশ ইচ্ছা ও বাঙ সমন্বয়ের মাঝে কবি তাই এখানেই ‘বাক’ দিয়েই শিল্প শৈলী মণ্ডিত সুন্দর শব্দ কলি সংযোজনে এক অনুপম শব্দ পংক্তির অবকাঠামো নির্মাণে স্রষ্টা এবং দ্রষ্টার ভূমিকা পালন করেন। সাধারণত কবি তখন অদৃশ্য প্রকৃতির খেয়ালি ক্রিয়ার ক্রীড়ানকে রূপান্তরিত হন মোহাবিষ্টের মত। ঠিক তেমনি পাঠকও মোহাবিষ্ট হন করির নিবিড় উচ্চারণে। মুকুল রায়ের কবিতাগুলো পাঠককে নিয়ে যায় এক আদিম ধ্যানস্থ জগতে। মুকুল রায়ের কবিতায় ব্যবহৃত অপূর্ব শব্দাবলী, চিত্রকল্প, মিথ, দর্শন কবিতাগুলিকে দিয়েছে নান্দনিক উৎকর্ষতা।
‘জীবন সংক্রান্ত শব্দ’ কাব্যগ্রন্থের শিরোনাম কবিতাটি যেন পুরো কাব্যগ্রন্থের দীপ্তিমান প্রতিচ্ছবি।
“আকাশের তারা খসে গেলে স্বস্থানে ফেরে না কোনদিন
তবুও তো তা জীবন ছিল
নিজস্ব আবাস ছিল, গতির দ্যোতনা ছিল
ভালোবাসার বর্ণিলতা ছিল একদিন।
আরও তো থাকতে পারে রাবণের চিতার মতো অনির্বাণ হাহাকার
আর-
বাউলের একতারার উন্মনা শোকগীতি।”
কবি নিজেকে লীন করে ফেলেন জাগতিক বিবিক্ত সুখ কিংবা বেদনায়। সে সব ব্যথাও সুখানুভবের নির্যাসে নিজেকে করে তোলেন ব্যথাসিক্ত ও নির্যাসিত। সে ব্যথার অন্তরজ্বালায় ও সুখ নির্যাসের সুরভিতে সুরভিত হয়ে তিনি প্রকাশের প্রত্যাশায় হয়ে ওঠেন ব্যাকুল। একটা সুন্দর শব্দই হচ্ছে কবির প্রকাশের উত্তম ত্রিপিটক। একজন কবি তাই হন্যে হয়ে ঘুরে ফেরেন সুন্দর শব্দাবলীর সন্ধানে। শব্দের মায়াজাল সৃষ্টিই তো কবিতার অঙ্গশ্রী।
কাব্যগ্রন্থটি সম্পর্কে প্রথিতযশা কবি আসাদ চৌধুরী বলেছেনঃ
“বিভিন্ন ছন্দে ছোট ছোট লিরিক দিয়ে বইটি সাজিয়েছেন, লেখাগুলো বারবার পড়তে ইচ্ছে করলে দোষ দেওয়া যাবে না। দীর্ঘ কবিতাও আছে, দার্শনিকতার উত্তরীয় চাপানো বলে এবং অন্তরঙ্গ উচ্চারণের ফলে চেপে ধরে না। ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ বন্ধুদের ভালো লাগতে পারে, কিন্তু আবেগের অন্তরঙ্গ প্রকাশ হৃদয়ানবতীদের মন ছুঁয়ে যাবেই। আর এই গুণটি যে তিনি রপ্ত করেছেন, তা বলতে পারি।”
মুকুল রায়ের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘মেঘবালিকা’। তাঁর স্বভাব, প্রকৃতি, চিত্রকল্প ও সৌন্দর্য সমূহের একটা সমন্বয়কৃত বিন্যাস, যাতে তাঁর নিরবিচ্ছিন্ন সাধনায় নতুন নতুন সৃজনী প্রবাহের লক্ষণাক্রান্ত। তাঁর সংবেদনশীল সত্ত্বা ক্রম পরিবর্তনশীল। যা সমগ্র মানব মনের এক বৈশিষ্ট্য জাত উজ্জীবনের ইঙ্গিত বহন করে।
কবির সমস্ত কবিতার বিষয় বস্তুর মৌলিক উপাদান উঠে এসেছে প্রকৃতি বর্ণনা শৈলীর নানান প্রভাব, পল্লীর নিবিড় বিষয় এবং নৈসর্গিক চেতনা ধরা দিয়েছে লালিত সুষমায়। একজন দার্শনিক কবিকে খুঁজে পেতে তিলমাত্রও বেগ পেতে হয় না। এই কাব্যগ্রন্থের ‘শরীরের মন’ কবিতাটি হতে পারে দার্শনিক কবি মুকুল রায়ের বোধিতায়তনের উৎকৃষ্ট নমুনা।
“শরীরই বোঝ তুমি, মন তো বোঝ না
শরীরেরও মন আছে, সে মন খোঁজ না”।
ওপার বাংলার বিশিষ্ট কবি ও সমালোচক সুজাতা পাল ‘মেঘবালিকা’-র চমৎকার সমালোচনা করেছেন ‘মেঘবালিকার উড়াল কথা’ শিরোনামে। তাঁর ভাষায়ঃ “বহুদর্শী অভিজ্ঞা কবির দৃষ্টি এড়িয়ে যায় না কোনো কিছুই। অনুবীক্ষনিক অনুসন্ধানে ধরা পড়ে যায় জীবনে রংগুলো। আর তিনি পরম নিষ্ঠায়, তদগতচিত্তে পাতার পর পাতায় তুলির একেকটি আচড়ে ছবিগুলো আমাদের সামনে তুলে ধরেন।...... তবু বলব কবি মনভোলা হলেও পথভোলা নন। তাই তো জীবনের পথে চলতে চলতে তিনি অনেক মূল্যবান নুড়ি পাথর আমাদের উপহার দিয়েছেন ‘মেঘবালিকা’র অসংখ্য কবিতায়।”
‘হৃদয় ছিল বলে অনুপম সৌন্দর্য’ মুকুল রায়ের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। এ কাব্যে ঋজু দীপ্ত ভাষাভঙ্গি তাঁর কবিতার বিশেষ অলংকার হলেও শব্দ নিয়ে তিনি যাদুকরের মতো খেলা করেছেন। প্রেম, প্রকৃতি ও নারী ইত্যাদি আবহমান বিষয়গুলো অবলোকনসহ তিনি এঁকেছেন তার চিত্ররূপ। এই কাব্যের ‘উৎসব কলরব’ কবিতাটি যেন জারক রসে সিক্ত করেছে কবিকে।
“তোমার শরীরে জাগে নবান্ন উৎসব...
চতুর্দিকে জেগে ওঠা গর্ভবতী কলরব
বাতাসের বাঁকে বাঁকে আদিমতাকে ডাকে
আর
তোমার সোনালী শস্যের নতমুখী ভার
আমাকে বিলিয়ে যায় নস্টালজিয়া...!”
কবিও যৌন অভিপ্রায়ে সংক্রামিত। ফ্রয়েডীয় ধারণায়ঃ মানুষ মাত্রেই ইডিপাসিও কমপ্লেক্সের শিকার। প্রত্যেক মানুষের অবচেতন মনে ঘুমিয়ে থাকে সহজাত যৌন সংক্রমণ। যা থেকে মানুষের পরিত্রাণ নেই। যৌন চেতনার কোন ক্ষয় নেই, নিবৃত্তিও নেই। বরং এর বৃদ্ধি আছে বংশগতিতে। মনের অবচেতনে সুপ্ত হয়ে থাকা অভীপ্সা যখন ঘুমের মাঝে স্নায়বিক মনস্কে স্মৃতির পাখনায় ডানা মেলে, আঁধার কুয়াশা পর্দা ভেদ করে ভেসে ওঠে স্বপ্ন হয়ে।
কবির চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘মন বচন প্রবচন’। এই কব্যের প্রত্যেকটি কবিতা যেন বাণীর মত অমোঘ উচ্চারণ। যেন আর্য শ্লোকের চেয়েও পবিত্র এই উচ্চারণ। কবিতাগুলো অনেকটা বাণী বন্দনার আদলে লেখা নিপুণ দার্শনিকতার দালিলিক প্রকাশ।
“বাহিরের ঝড় ভেঙে দেয় ঘর
মনের বয় ঝড় ভাঙে অন্তর”
মুকুল রায়ের পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ ‘দিগন্তে নীলিমা পোড়ে’ এর ভাব ও ভাবনা প্রাগ্রসর। এ গ্রন্থের কবিতা নির্মাণের বিষয়বস্তু নির্বাচন ও শব্দ চয়নে কবি নতুনত্বের অভিসারে তাঁর কবিতার ছায়া হরিণের ধূপশিখায় এক ধরণের কস্তুরী মিশ্রিত সুরভীর আবহ প্রচ্ছন্নভাবে বিরাজিত। এ প্রচ্ছন্নতার অন্তরালে জেগে থাকে হৃদয়ের মানবিক চরাঙ্গন ও সমাজের বাস্তব প্রেক্ষাপট। একজন মননশীল চিত্রকরের মতো তিনি স্ব হাতের তুলিতে তা এঁকেছেন অবলীলায় অকপটে।
‘দিগন্তে নীলিমা পোড়ে’ কবিতাটিতে ধ্বনিত হয়েছে জীবন জিজ্ঞাসার বিমূর্ত অনুরণন। এ যেন কবির আত্মার সাথে কথোপকথন।
“দিপ্রহরে বাতাস পোড়ে
দিগন্তে নীলিমা পোড়ে
তারও ওপারে পোড়ে তারা অগণন
অরণ্যে বৃক্ষেরা পোড়ে
চিতায় শরীর পোড়ে
কেউ রাখে না খবর-
কোথায় পোড়ে মন...”
কাব্যের উদ্দেশ্য জগত ও জীবনের রহস্যকে সুন্দর করে রসস্নিগ্ধ করে পরিবেশন করা। কবিদের কাছে সৌন্দর্যই পরম সত্যরূপে পরিগণিত। এই সৌন্দর্য সৃষ্টিই কবিতার উদ্দেশ্য। ম্যাথুউ আর্নল্ড বলেছেন, ‘Criticism of Life’. অর্থাৎ জীবন-দীপিকা বা জীবন-জিজ্ঞাসা। কাব্য বিচারে নীতি প্রাধান্য আনলে কাব্যকে ছোট করা হয়। কাব্যের নীতি তার নির্মাণ নীতি ছাড়া কিছুই নয়। কাব্য মূলতঃ নীতিবাচক নয়, নীতিদ্রোহীও নয়। কাব্য নীতির ঊর্ধ্বে থেকে সত্যের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
‘দিগন্তে নীলিমা পোড়ে’ কাব্যগ্রন্থটি সম্পর্কে প্রশংসাধন্য মন্তব্য করেছেন বাংলদেশের প্রধান কবি নির্মলেন্দু গুণ। তাঁর বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য-
“...সময়ের আলোকিত কবি মুকুল রায় তেমনি স্বাধীনচেতা ও সত্যানুসন্ধানী একজন বিদগ্ধ কবি। মুকুল রায়ের ‘দিগন্তে নীলিমা পোড়ে’ কাব্যগ্রন্থটি সুখপাঠ্য ও জীবন দর্শন সমৃদ্ধ। যা সব শ্রেণীর পাঠকের কাছে ভালো লাগবে বলে আমি মনে করি। এই বইটি পাঠক মহলে জনপ্রিয়তা পেলে খুশি হবো।”
মুকুল রায় ছড়াসাহিত্যেও অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর প্রকাশিত ছড়াগ্রন্থগুলো হল- ‘ঐশী মনির অভিমান’, ‘ভূতের সাথে খেলা’, ‘ছড়ায় ভরায় মন’, ‘ ছড়িয়ে দিলাম ছড়া’।
‘খোকা এলো কোলভরে’ ছড়াটি যেন ছড়াকার মুকুল রায়ের সমগ্র ছড়ার স্বতঃসিদ্ধ নির্মাণের প্রতিনিধিত্ব করে।
“খোকা এলো কোল ভরে
ফোকলা মুখে লোল ঝরে
হাসলে গালে টোল পড়ে।”
ছড়াটিকে সহজেই স্বরবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্ত ছন্দে ফেলা যায়। ছড়া নির্মাণে মুকুল রায় যে অসাধারণ পারঙ্গম তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
গীতিকবিতায়ও মুকুল রায় তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। এগারোটি গান নিয়ে প্রকাশিত হয়ে ‘মনচুরি’ নামে একটি গানের অ্যালবাম। গানগুলোতে প্রেম, প্রকৃতি, জীবনদর্শন ও আধ্যাত্মচেতনা উঠে এসেছে নিবিড় মুগ্ধতায়।
মুকুল রায়ের দুটি গল্পগ্রন্থ হল- ‘লাল টিপ’ ও ‘যে জীবন ফড়িঙের’। ‘জ্যোছনা রাতে ভূতের সাথে’ এবং ‘তনু ও একটি পাখির গল্প’ - এদুটি শিশুতোষ গল্প বই।
গল্পগুলোতে মুকুল রায় মূলত অনিরাময়যোগ্য ক্ষতকে তাঁর সকল উচ্চারণের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্রতিস্থাপিত করেছেন, তা বস্তুত ভালোবাসারই ক্ষত। আপেক্ষিক গুরুত্ব অনুযায়ী ঐ ভালোবাসা নিঃসরিত হয় নারী-দেশ-দেশের মানুষ প্রভৃতির প্রতি। তবে মুকুল রায় প্রসঙ্গে যেটি প্রণিধানযোগ্য তা হল এই যে, তিনি প্রাধান্য দেন মনন চেতনাকে, শৈল্পিক উৎকর্ষকে। শিল্পের প্রয়োজনেই অতঃপর তিনি ভালোবাসেন নারীকে, দক্ষ চিত্রশিল্পী যেমন পছন্দ করেন কোন একটি রঙ কিংবা একই সাথে অনেক রঙকে। নারী এক্ষেত্রে হয়ে যায় তাঁর শিল্পের কাঁচামাল, শিল্পের জন্যই একটি অপরিহার্য পণ্য, একটি ব্যবহার্য সামগ্রী-কখনো কখনো শিল্পের মত জীবনের জন্যও বটে।
প্রতিভা অনেকটা টর্চ লাইটের আলোর মত। টর্চ লাইটের সুইচ অন করলে যেমন আলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিভাও তেমন বেরিয়ে আসার জন্য মাধ্যম খোঁজে। মুকুল রায়ও ঠিক তেমনই সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার মাধ্যমে তিনি বেরিয়ে এসেছেন তাঁর অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর সৃষ্টি করে। তিনি সাহিত্যের একজন একনিষ্ঠ পূজারী। এইজন্য অনায়াসেই মুকুল রায়কে বহুমাত্রিক লেখক বলে আখ্যায়িত করা যায়। তাঁর অসাধারণ সৃষ্টির আলোকে সমৃদ্ধ হোক বাংলা সাহিত্য। এই হোক প্রত্যাশা।
মুকুল রায় বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব। তিনি
একাধারে একজন কবি, ছড়াকার, গীতিকার ও
কথাসাহিত্যিক। পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ, ভ্রমণোপন্যাস,গল্পগ্রন্থ ও ছড়াগ্রন্থসহ প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা মোট ১৪ টি।
জন্ম বৃহত্তর রংপুরের লালমনিরহাট জেলার কুলাঘাট ইউনিয়নের বড়–য়া গ্রামস্থ গোবিন্দপাড়ার সম্ভ্রান্ত গোবিন্দবাড়িতে। বাড়ির সাংস্কৃতিক পরিবেশে ছেলেবেলাতেই সঙ্গীতে এবং বাড়ির পারিবারিক লাইব্রেরীতে সাহিত্য চর্চায় হাতেখড়ি। রংপুরের কারমাইকেল কলেজে পড়াশোনার সময় আশির দশকে কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটলেও প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘জীবন সংক্রান্ত শব্দ’ খ্যাতিমান কবি আসাদ চৌধুরীর উচ্ছ্বসিত প্রশংসার শুভাশীষ নিয়ে প্রকাশ হয় ২০১১ খৃষ্টাব্দে। আশির দশকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দৈনিক ‘সংবাদ’ পত্রিকায় কবির লেখা ধারাবাহিক ফিচার ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চিঠি’ সেই সময়ে বেশ সাড়া ফেলেছিল। বর্তমান সময়ে আসাম ভ্রমনের উপর লেখা পাঠক নন্দিত ভ্রমণোপন্যাস “বাগেশ্বরী পাহাড়” বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে কোলকাতা জয় করেছে - কোলকাতা ও শিলিগুড়ি থেকে একযোগে প্রকাশিত “দৈনিক প্রয়াগ” পত্রিকার সাহিত্য পাতায় উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। মুকুল রায়ের পাঠক নন্দিত ভ্রমণ-উপন্যাস বাগেশ্বরী পাহাড় বইটির অসমীয়া ভাষায় অনুবাদ করেছেন আসামের লেখিকা সঙ্গীতা বরুয়া শঈকিয়া।
বাগেশ্বরী পাহাড় ভ্রমণোপন্যাসটিতে লেখকের মননচরিত ও শিল্পবোধ অপূর্ব প্রত্যক্ষতায় জীবন ঘনিষ্ঠ প্রকাশে বাঙময় হয়ে উঠেছে। লেখক মুকুল রায় বিগত শতকের পঁচাত্তর-ছিয়াত্তর সালের দিকে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য, সপ্তকন্যার এক কন্যা ‘বাগেশ্বরী পাহাড়’ দেখতে কয়েকমাস আসাম এবং বঙাইগাঁও ঘুরে বেড়িয়েছেন অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে। বাগেশ্বরী পাহাড় লিখতে গিয়ে যেন লেখকের পুনর্জন্ম হয়েছে। লেখকের ভাষ্যমতেঃ
জন্ম বৃহত্তর রংপুরের লালমনিরহাট জেলার কুলাঘাট ইউনিয়নের বড়–য়া গ্রামস্থ গোবিন্দপাড়ার সম্ভ্রান্ত গোবিন্দবাড়িতে। বাড়ির সাংস্কৃতিক পরিবেশে ছেলেবেলাতেই সঙ্গীতে এবং বাড়ির পারিবারিক লাইব্রেরীতে সাহিত্য চর্চায় হাতেখড়ি। রংপুরের কারমাইকেল কলেজে পড়াশোনার সময় আশির দশকে কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটলেও প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘জীবন সংক্রান্ত শব্দ’ খ্যাতিমান কবি আসাদ চৌধুরীর উচ্ছ্বসিত প্রশংসার শুভাশীষ নিয়ে প্রকাশ হয় ২০১১ খৃষ্টাব্দে। আশির দশকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দৈনিক ‘সংবাদ’ পত্রিকায় কবির লেখা ধারাবাহিক ফিচার ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চিঠি’ সেই সময়ে বেশ সাড়া ফেলেছিল। বর্তমান সময়ে আসাম ভ্রমনের উপর লেখা পাঠক নন্দিত ভ্রমণোপন্যাস “বাগেশ্বরী পাহাড়” বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে কোলকাতা জয় করেছে - কোলকাতা ও শিলিগুড়ি থেকে একযোগে প্রকাশিত “দৈনিক প্রয়াগ” পত্রিকার সাহিত্য পাতায় উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। মুকুল রায়ের পাঠক নন্দিত ভ্রমণ-উপন্যাস বাগেশ্বরী পাহাড় বইটির অসমীয়া ভাষায় অনুবাদ করেছেন আসামের লেখিকা সঙ্গীতা বরুয়া শঈকিয়া।
বাগেশ্বরী পাহাড় ভ্রমণোপন্যাসটিতে লেখকের মননচরিত ও শিল্পবোধ অপূর্ব প্রত্যক্ষতায় জীবন ঘনিষ্ঠ প্রকাশে বাঙময় হয়ে উঠেছে। লেখক মুকুল রায় বিগত শতকের পঁচাত্তর-ছিয়াত্তর সালের দিকে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য, সপ্তকন্যার এক কন্যা ‘বাগেশ্বরী পাহাড়’ দেখতে কয়েকমাস আসাম এবং বঙাইগাঁও ঘুরে বেড়িয়েছেন অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে। বাগেশ্বরী পাহাড় লিখতে গিয়ে যেন লেখকের পুনর্জন্ম হয়েছে। লেখকের ভাষ্যমতেঃ
“...বাগেশ্বরী পাহাড় লিখতে গিয়ে আমার পুনর্জন্ম হল! আমি যেন সেখানে ফেলে আসা আমার হারানো সোনাঝরা সেই বর্ণালী দিনগুলোকে আবার কুড়িয়ে পেলাম! সেই সাথে যেন আবারও ফিরে পেলাম অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া আমার সেই প্রিয় সেজদি, সেজ জামাইবাবুসহ না ফেরার দেশে চলে যাওয়া আসামের সেই প্রিয় মুখগুলোকে, যারা একদিন আমাকে করে নিয়েছিল তাদের আপনজন করে; তাদের সাথে আবারও যেন উপভোগ করে এলাম সেই আনন্দঘন দিনগুলোকে! ফিরে পেলাম সেই সময়কে, সেই মুহূর্তকে, সেই মায়াময় অনুভূতিকে! কত যুগ পরে, আবারও আমি তাদের সাথে মিশলাম, আনন্দে ভাসলাম, আপ্লুত হলাম, কাঁদলাম! আর আমার এ জীবনকে ছাপিয়ে গেল অন্য আর এক জীবন! ধন্য আমি, আমার এমন একটি জীবন ছিল!”
‘বাগেশ্বরী পাহাড়’ ভ্রমণোপন্যাসে বঙাঁইগাঁও ও আসামের বোহেমিয়ান জিপসি মানুষগুলোর ভাগ্যের সন্ধানে নিয়ত ছুটে চলা, তাদের যাপিত জীবনের সমুহ যন্ত্রণা, প্রেম, বিরম, হাসি-কান্না, পাওয়া না পাওয়ার গল্প অপূর্ব লালিত্যে বর্ণনা করেছেন কথাসাহিত্যিক মুকুল রায়।
‘বাগেশ্বরী পাহাড়’ থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করছিঃ
“হাঁটতে হাঁটতে পিছনের সম্মিলিত হাসির কলতান আর কথার কলরব শুনতে শুনতে আমি অনুভব করি, বঙাঁইগাঁওয়ের এই কলোনিতে বসবাসকারী দেশভাগের ফলে শেকড়চ্যুত বাস্তুচ্যুত পূর্ব বাংলার অভাগা বাঙালী, ভারতের অন্যান্য প্রদেশ থেকে আসা ভাগ্যান্বেষী অবাঙালী আর আসামের গ্রাম থেকে উঠে আসা সহজ-সরল অসমীয়া মানুষগুলো তাদের ভিন্ন-ভাষা, ভিন্ন-সংস্কৃতি, ভিন্ন-ধারার জীবন-যাপন আচার-আচরণ নিয়েও এক আন্তরিক সৌহার্দ্যে যুগযুগ ধরে একত্রে বসবাস করে আসছে, আর তাদের নিত্যদিনের ছোট ছোট এইসব হাসি-ঠাট্টা, আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ শেকড়হীন এই মানুষগুলোর মধ্যে ক্রমশঃ এক নতুন শেকড়ের জন্ম দিচ্ছে, জন্ম হচ্ছে নতুন এক সংস্কৃতির... যে সংস্কৃতি ধর্মীয়, জাতিগত, সম্প্রদায়গত, ভাষাগত ও প্রাদেশিকতার হিংসা-ঘৃণা-বিদ্বেষ-বিভেদ ভুলে সকলকে নিয়ে বেঁচে থাকার নতুন স্বপ্ন দেখায়...।”
‘বাগেশ্বরী পাহাড়’ ভ্রমণোপন্যাস সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত মন্তব্য করেছেন কবি মুহাম্মদ নুরুল হুদাঃ
“শেকড়হীন এই মানুষগুলোর বেঁচে থাকার তাগিদে একে অন্যের সহমর্মী হয়ে উঠেছে। তাদের ভেতর ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক বা জাতিগত কোন দ্বন্দ্ব নেই। জীবনের তাগিদে জীবন এবং মানুষকে ভালোবেসে তারা গড়ে তুলেছে ভালোবাসার এক নতুন পৃথিবী। মুকুল রায়ের পাঠক নন্দিত এই ‘বাগেশ্বরী পাহাড়’ ভ্রমণোপন্যাসটির পাঠক প্রিয়তা কালজয়ী হবে বলে আমার বিশ্বাস।”
ড. সরিফা সালোয়া ডিনা 'বাগেশ্বরী পাহাড় : বঙ্গাইগাঁও দর্শনকথা' শীর্ষক প্রবন্ধে বাগেশ্বরী পাহাড়ের নান্দনিক আলোচনা করেছেন। সেটির কিছু অংশ উল্লেখ করছিঃ
“...‘বাগেশ্বরী পাহাড়’-এর উল্লেখযোগ্য অংশ হলো, ভারতের সেভেন-সিস্টার-এর এক সিস্টার আসাম ও রংপুরের নাম ও অঞ্চলভিত্তিক পরিচিতি প্রদান। অসমিয়া বা অ্যাসামিজ ভাষায় আসামকে "অহোম" বলা হয়। "ব্রক্ষ্মপুত্র নদের উপত্যকা ও বরাক উপত্যকা এই দুই উপত্যকাসহ কাছাড় ও কার্বি আংলাং-এর পার্বত্য এলাকা নিয়ে ভোট-চিন-তিব্বতি-মঙ্গোলিয় সম্মিলনে এক বিচিত্র জনগোষ্ঠীর আবাসভূমি এই পাহাড়ঘেরা রাজ্য আসাম, বাংলাদেশের উত্তপূর্বের রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট - এই তিন বৃহত্তর জেলার প্রতিবেশী...."।
এদের মধ্যে বৃহত্তর রংপুরের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক আসামের। কারণ, ইতিহাসখ্যাত "প্রাগজ্যোতিষপুর" রাজ্য, পরবর্তীকালে "কামরুপ" এবং আরও পরে " কামতাবিহার" বা "কামতাপুর" নামে পরিচিতি লাভ করে। আর, ঐতিহাসিকভাবেই "রঙ্গপুর" বা "রংপুর" প্রাগজ্যোতিষপুরের অন্তর্গত ছিল।”
একজন কথাসাহিত্যিক হিসেবে তিনি যেমন পরিচয় দিয়েছেন অসাধারণ মুন্সিয়ানার তেমনি কাব্যসাহিত্যে তার কিছু ব্যত্যয় ঘটেনি। এ পর্যন্ত তাঁর পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
সমকালীন জীবন চেতনায় মুকুল রায়ের হাতেখড়ির কাব্যগ্রন্থ ‘জীবন সংক্রান্ত শব্দ’। কবিতা শঙ্খনীল শব্দের কারুকাজ এবং একটি শিল্পিত বোধের খোলা বাতায়ন। এই খোলা বাতায়নে কবির মানসপটে ভেসে ওঠে বাঙময় ঢেউয়ের অস্থির প্রকাশ ইচ্ছা। প্রকাশ ইচ্ছা ও বাঙ সমন্বয়ের মাঝে কবি তাই এখানেই ‘বাক’ দিয়েই শিল্প শৈলী মণ্ডিত সুন্দর শব্দ কলি সংযোজনে এক অনুপম শব্দ পংক্তির অবকাঠামো নির্মাণে স্রষ্টা এবং দ্রষ্টার ভূমিকা পালন করেন। সাধারণত কবি তখন অদৃশ্য প্রকৃতির খেয়ালি ক্রিয়ার ক্রীড়ানকে রূপান্তরিত হন মোহাবিষ্টের মত। ঠিক তেমনি পাঠকও মোহাবিষ্ট হন করির নিবিড় উচ্চারণে। মুকুল রায়ের কবিতাগুলো পাঠককে নিয়ে যায় এক আদিম ধ্যানস্থ জগতে। মুকুল রায়ের কবিতায় ব্যবহৃত অপূর্ব শব্দাবলী, চিত্রকল্প, মিথ, দর্শন কবিতাগুলিকে দিয়েছে নান্দনিক উৎকর্ষতা।
‘জীবন সংক্রান্ত শব্দ’ কাব্যগ্রন্থের শিরোনাম কবিতাটি যেন পুরো কাব্যগ্রন্থের দীপ্তিমান প্রতিচ্ছবি।
“আকাশের তারা খসে গেলে স্বস্থানে ফেরে না কোনদিন
তবুও তো তা জীবন ছিল
নিজস্ব আবাস ছিল, গতির দ্যোতনা ছিল
ভালোবাসার বর্ণিলতা ছিল একদিন।
আরও তো থাকতে পারে রাবণের চিতার মতো অনির্বাণ হাহাকার
আর-
বাউলের একতারার উন্মনা শোকগীতি।”
কবি নিজেকে লীন করে ফেলেন জাগতিক বিবিক্ত সুখ কিংবা বেদনায়। সে সব ব্যথাও সুখানুভবের নির্যাসে নিজেকে করে তোলেন ব্যথাসিক্ত ও নির্যাসিত। সে ব্যথার অন্তরজ্বালায় ও সুখ নির্যাসের সুরভিতে সুরভিত হয়ে তিনি প্রকাশের প্রত্যাশায় হয়ে ওঠেন ব্যাকুল। একটা সুন্দর শব্দই হচ্ছে কবির প্রকাশের উত্তম ত্রিপিটক। একজন কবি তাই হন্যে হয়ে ঘুরে ফেরেন সুন্দর শব্দাবলীর সন্ধানে। শব্দের মায়াজাল সৃষ্টিই তো কবিতার অঙ্গশ্রী।
কাব্যগ্রন্থটি সম্পর্কে প্রথিতযশা কবি আসাদ চৌধুরী বলেছেনঃ
“বিভিন্ন ছন্দে ছোট ছোট লিরিক দিয়ে বইটি সাজিয়েছেন, লেখাগুলো বারবার পড়তে ইচ্ছে করলে দোষ দেওয়া যাবে না। দীর্ঘ কবিতাও আছে, দার্শনিকতার উত্তরীয় চাপানো বলে এবং অন্তরঙ্গ উচ্চারণের ফলে চেপে ধরে না। ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ বন্ধুদের ভালো লাগতে পারে, কিন্তু আবেগের অন্তরঙ্গ প্রকাশ হৃদয়ানবতীদের মন ছুঁয়ে যাবেই। আর এই গুণটি যে তিনি রপ্ত করেছেন, তা বলতে পারি।”
মুকুল রায়ের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘মেঘবালিকা’। তাঁর স্বভাব, প্রকৃতি, চিত্রকল্প ও সৌন্দর্য সমূহের একটা সমন্বয়কৃত বিন্যাস, যাতে তাঁর নিরবিচ্ছিন্ন সাধনায় নতুন নতুন সৃজনী প্রবাহের লক্ষণাক্রান্ত। তাঁর সংবেদনশীল সত্ত্বা ক্রম পরিবর্তনশীল। যা সমগ্র মানব মনের এক বৈশিষ্ট্য জাত উজ্জীবনের ইঙ্গিত বহন করে।
কবির সমস্ত কবিতার বিষয় বস্তুর মৌলিক উপাদান উঠে এসেছে প্রকৃতি বর্ণনা শৈলীর নানান প্রভাব, পল্লীর নিবিড় বিষয় এবং নৈসর্গিক চেতনা ধরা দিয়েছে লালিত সুষমায়। একজন দার্শনিক কবিকে খুঁজে পেতে তিলমাত্রও বেগ পেতে হয় না। এই কাব্যগ্রন্থের ‘শরীরের মন’ কবিতাটি হতে পারে দার্শনিক কবি মুকুল রায়ের বোধিতায়তনের উৎকৃষ্ট নমুনা।
“শরীরই বোঝ তুমি, মন তো বোঝ না
শরীরেরও মন আছে, সে মন খোঁজ না”।
ওপার বাংলার বিশিষ্ট কবি ও সমালোচক সুজাতা পাল ‘মেঘবালিকা’-র চমৎকার সমালোচনা করেছেন ‘মেঘবালিকার উড়াল কথা’ শিরোনামে। তাঁর ভাষায়ঃ “বহুদর্শী অভিজ্ঞা কবির দৃষ্টি এড়িয়ে যায় না কোনো কিছুই। অনুবীক্ষনিক অনুসন্ধানে ধরা পড়ে যায় জীবনে রংগুলো। আর তিনি পরম নিষ্ঠায়, তদগতচিত্তে পাতার পর পাতায় তুলির একেকটি আচড়ে ছবিগুলো আমাদের সামনে তুলে ধরেন।...... তবু বলব কবি মনভোলা হলেও পথভোলা নন। তাই তো জীবনের পথে চলতে চলতে তিনি অনেক মূল্যবান নুড়ি পাথর আমাদের উপহার দিয়েছেন ‘মেঘবালিকা’র অসংখ্য কবিতায়।”
‘হৃদয় ছিল বলে অনুপম সৌন্দর্য’ মুকুল রায়ের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। এ কাব্যে ঋজু দীপ্ত ভাষাভঙ্গি তাঁর কবিতার বিশেষ অলংকার হলেও শব্দ নিয়ে তিনি যাদুকরের মতো খেলা করেছেন। প্রেম, প্রকৃতি ও নারী ইত্যাদি আবহমান বিষয়গুলো অবলোকনসহ তিনি এঁকেছেন তার চিত্ররূপ। এই কাব্যের ‘উৎসব কলরব’ কবিতাটি যেন জারক রসে সিক্ত করেছে কবিকে।
“তোমার শরীরে জাগে নবান্ন উৎসব...
চতুর্দিকে জেগে ওঠা গর্ভবতী কলরব
বাতাসের বাঁকে বাঁকে আদিমতাকে ডাকে
আর
তোমার সোনালী শস্যের নতমুখী ভার
আমাকে বিলিয়ে যায় নস্টালজিয়া...!”
কবিও যৌন অভিপ্রায়ে সংক্রামিত। ফ্রয়েডীয় ধারণায়ঃ মানুষ মাত্রেই ইডিপাসিও কমপ্লেক্সের শিকার। প্রত্যেক মানুষের অবচেতন মনে ঘুমিয়ে থাকে সহজাত যৌন সংক্রমণ। যা থেকে মানুষের পরিত্রাণ নেই। যৌন চেতনার কোন ক্ষয় নেই, নিবৃত্তিও নেই। বরং এর বৃদ্ধি আছে বংশগতিতে। মনের অবচেতনে সুপ্ত হয়ে থাকা অভীপ্সা যখন ঘুমের মাঝে স্নায়বিক মনস্কে স্মৃতির পাখনায় ডানা মেলে, আঁধার কুয়াশা পর্দা ভেদ করে ভেসে ওঠে স্বপ্ন হয়ে।
কবির চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘মন বচন প্রবচন’। এই কব্যের প্রত্যেকটি কবিতা যেন বাণীর মত অমোঘ উচ্চারণ। যেন আর্য শ্লোকের চেয়েও পবিত্র এই উচ্চারণ। কবিতাগুলো অনেকটা বাণী বন্দনার আদলে লেখা নিপুণ দার্শনিকতার দালিলিক প্রকাশ।
“বাহিরের ঝড় ভেঙে দেয় ঘর
মনের বয় ঝড় ভাঙে অন্তর”
মুকুল রায়ের পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ ‘দিগন্তে নীলিমা পোড়ে’ এর ভাব ও ভাবনা প্রাগ্রসর। এ গ্রন্থের কবিতা নির্মাণের বিষয়বস্তু নির্বাচন ও শব্দ চয়নে কবি নতুনত্বের অভিসারে তাঁর কবিতার ছায়া হরিণের ধূপশিখায় এক ধরণের কস্তুরী মিশ্রিত সুরভীর আবহ প্রচ্ছন্নভাবে বিরাজিত। এ প্রচ্ছন্নতার অন্তরালে জেগে থাকে হৃদয়ের মানবিক চরাঙ্গন ও সমাজের বাস্তব প্রেক্ষাপট। একজন মননশীল চিত্রকরের মতো তিনি স্ব হাতের তুলিতে তা এঁকেছেন অবলীলায় অকপটে।
‘দিগন্তে নীলিমা পোড়ে’ কবিতাটিতে ধ্বনিত হয়েছে জীবন জিজ্ঞাসার বিমূর্ত অনুরণন। এ যেন কবির আত্মার সাথে কথোপকথন।
“দিপ্রহরে বাতাস পোড়ে
দিগন্তে নীলিমা পোড়ে
তারও ওপারে পোড়ে তারা অগণন
অরণ্যে বৃক্ষেরা পোড়ে
চিতায় শরীর পোড়ে
কেউ রাখে না খবর-
কোথায় পোড়ে মন...”
কাব্যের উদ্দেশ্য জগত ও জীবনের রহস্যকে সুন্দর করে রসস্নিগ্ধ করে পরিবেশন করা। কবিদের কাছে সৌন্দর্যই পরম সত্যরূপে পরিগণিত। এই সৌন্দর্য সৃষ্টিই কবিতার উদ্দেশ্য। ম্যাথুউ আর্নল্ড বলেছেন, ‘Criticism of Life’. অর্থাৎ জীবন-দীপিকা বা জীবন-জিজ্ঞাসা। কাব্য বিচারে নীতি প্রাধান্য আনলে কাব্যকে ছোট করা হয়। কাব্যের নীতি তার নির্মাণ নীতি ছাড়া কিছুই নয়। কাব্য মূলতঃ নীতিবাচক নয়, নীতিদ্রোহীও নয়। কাব্য নীতির ঊর্ধ্বে থেকে সত্যের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
‘দিগন্তে নীলিমা পোড়ে’ কাব্যগ্রন্থটি সম্পর্কে প্রশংসাধন্য মন্তব্য করেছেন বাংলদেশের প্রধান কবি নির্মলেন্দু গুণ। তাঁর বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য-
“...সময়ের আলোকিত কবি মুকুল রায় তেমনি স্বাধীনচেতা ও সত্যানুসন্ধানী একজন বিদগ্ধ কবি। মুকুল রায়ের ‘দিগন্তে নীলিমা পোড়ে’ কাব্যগ্রন্থটি সুখপাঠ্য ও জীবন দর্শন সমৃদ্ধ। যা সব শ্রেণীর পাঠকের কাছে ভালো লাগবে বলে আমি মনে করি। এই বইটি পাঠক মহলে জনপ্রিয়তা পেলে খুশি হবো।”
মুকুল রায় ছড়াসাহিত্যেও অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর প্রকাশিত ছড়াগ্রন্থগুলো হল- ‘ঐশী মনির অভিমান’, ‘ভূতের সাথে খেলা’, ‘ছড়ায় ভরায় মন’, ‘ ছড়িয়ে দিলাম ছড়া’।
‘খোকা এলো কোলভরে’ ছড়াটি যেন ছড়াকার মুকুল রায়ের সমগ্র ছড়ার স্বতঃসিদ্ধ নির্মাণের প্রতিনিধিত্ব করে।
“খোকা এলো কোল ভরে
ফোকলা মুখে লোল ঝরে
হাসলে গালে টোল পড়ে।”
ছড়াটিকে সহজেই স্বরবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্ত ছন্দে ফেলা যায়। ছড়া নির্মাণে মুকুল রায় যে অসাধারণ পারঙ্গম তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
গীতিকবিতায়ও মুকুল রায় তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। এগারোটি গান নিয়ে প্রকাশিত হয়ে ‘মনচুরি’ নামে একটি গানের অ্যালবাম। গানগুলোতে প্রেম, প্রকৃতি, জীবনদর্শন ও আধ্যাত্মচেতনা উঠে এসেছে নিবিড় মুগ্ধতায়।
মুকুল রায়ের দুটি গল্পগ্রন্থ হল- ‘লাল টিপ’ ও ‘যে জীবন ফড়িঙের’। ‘জ্যোছনা রাতে ভূতের সাথে’ এবং ‘তনু ও একটি পাখির গল্প’ - এদুটি শিশুতোষ গল্প বই।
গল্পগুলোতে মুকুল রায় মূলত অনিরাময়যোগ্য ক্ষতকে তাঁর সকল উচ্চারণের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্রতিস্থাপিত করেছেন, তা বস্তুত ভালোবাসারই ক্ষত। আপেক্ষিক গুরুত্ব অনুযায়ী ঐ ভালোবাসা নিঃসরিত হয় নারী-দেশ-দেশের মানুষ প্রভৃতির প্রতি। তবে মুকুল রায় প্রসঙ্গে যেটি প্রণিধানযোগ্য তা হল এই যে, তিনি প্রাধান্য দেন মনন চেতনাকে, শৈল্পিক উৎকর্ষকে। শিল্পের প্রয়োজনেই অতঃপর তিনি ভালোবাসেন নারীকে, দক্ষ চিত্রশিল্পী যেমন পছন্দ করেন কোন একটি রঙ কিংবা একই সাথে অনেক রঙকে। নারী এক্ষেত্রে হয়ে যায় তাঁর শিল্পের কাঁচামাল, শিল্পের জন্যই একটি অপরিহার্য পণ্য, একটি ব্যবহার্য সামগ্রী-কখনো কখনো শিল্পের মত জীবনের জন্যও বটে।
প্রতিভা অনেকটা টর্চ লাইটের আলোর মত। টর্চ লাইটের সুইচ অন করলে যেমন আলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিভাও তেমন বেরিয়ে আসার জন্য মাধ্যম খোঁজে। মুকুল রায়ও ঠিক তেমনই সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার মাধ্যমে তিনি বেরিয়ে এসেছেন তাঁর অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর সৃষ্টি করে। তিনি সাহিত্যের একজন একনিষ্ঠ পূজারী। এইজন্য অনায়াসেই মুকুল রায়কে বহুমাত্রিক লেখক বলে আখ্যায়িত করা যায়। তাঁর অসাধারণ সৃষ্টির আলোকে সমৃদ্ধ হোক বাংলা সাহিত্য। এই হোক প্রত্যাশা।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন