একক কবিতার আলোচনা

জীবন-কবিতাঃ বিমল কুণ্ডু 

কবি বিমল কুণ্ডু তাঁর ‘জীবন-কবিতা’য় জীবনের অন্তর্গত অসুখের ফুল্ল চিৎকার অবলীলার বর্ণনা করেছেন সারল্যের পেলব জড়ানো ব্যক্তিগত জীবন দর্শনের আদলে কাব্যিক কলেবরের প্রাতিস্বিক বাঙময় প্রকাশে। 

কবিতার মূল বিষয় কবির চোখে ‘জীবন-কবিতা’র বীক্ষিত বীক্ষণ। এই জীবনবাদী কবিতা হৃদয়জাত অনুপম সৌকর্যের ধ্যানস্থ প্রতিফলন। কবি এখানে তাঁর জীবনের প্রিয় কবিতা, জীবন সহচরী প্রিয়তমার অনুভূতির সাথে তাঁর প্রতিক্রিয়ার কথা বলেছেন, যে প্রতিক্রিয়া জীবনের কথা বলে, জীবনের সাথে চলে। প্রিয়তমার সমস্ত অনুভূতি কবির ভালো লাগে। সমস্ত আবেগ-অনুভূতি কবির কাছে কাব্যিক মনে হয়। কবির প্রিয়তমা যখন কাঁদেন তখন কবির সেই কান্না ভালো লাগে তাই কবি প্রিয়তমাকে কাঁদান। প্রিয়ার আঁখি ঝরে আর কবি ব্যথার অশ্রুতে কাব্যের উৎস খুঁজে পান। "কাঁদালে তুমি মোরে ভালোবাসারই ঘায়ে/ নিবিড় বেদনাতে পুলক লাগে গায়ে।।"-রবীন্দ্রনাথ। 

কবির প্রেয়সী যখন হাসে তখন সেই হাসিতে মুগ্ধ হন কবি, তাই ভালোবাসেন তাকে হাসাতে। কারণ প্রিয়ার হাসিতে যেন মুক্ত ঝরে পড়ে। প্রেমিক কবি সেই হাসির ঝর্ণায় ভেসে ভেসে সাজান প্রিয় কবিতার মালা। 

তাই প্রিয়তমার প্রতি কবির উদাত্ত আহ্বানঃ 

এমনি করে মাঝেমধ্যে হাসো আর কাঁদো
তা হলে আমার কবিতায় সুখ-দুঃখ দুটিই থাকবে।

এইসব হাসি ও কান্নার আড়ালে যে কত ভালোবাসা আর বিরহ লুকিয়ে থাকে তার সীমা নেই। হাসির আড়ালে কতটা কান্না আর সুখের আড়ালে যে কতটা অসুখ জমে থাকে গোপনঅশ্রু হয়ে তা বলা কঠিন। কবি যেমন তাঁর প্রিয়তমার হাসিতে আনন্দিত হন তেমনি তাঁর বিরহে বেদনা ভারাক্রান্ত হন। নিজের প্রিয়তমা বা প্রিয়তমা স্ত্রী যখন সুখে থাকে তখন তাঁর সুখে ভরে ওঠে মন। কিন্তু যখন সে দুঃখে থাকে, অসুখী কিংবা অসুখে থাকে তখন সমস্ত পৃথিবী যেন নিমিষেই অন্ধকার হয়ে যায়। স্বপ্নসঙ্গিনীকে ভালো রাখার জন্য মনে হয় নিজের জীবনও এক নিমিষে দিয়ে দেওয়া যায়। বিশ্ব সংসার ওলট পালট করে দেওয়া যায় প্রিয়জনের সুখের জন্য। 

কবিতার শেষ দুই লাইনে কবি উচ্চারণ করেছেনঃ 

হাসি আর কান্না প্রেম আর বেদনা
মিলেমিশে একসাথে জীবনের ঠিকানা। 

জীবন হাসি আর কান্না, প্রেম আর বেদনার মর্মগাঁথা। হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ-মিলন এসবই জীবনের জাগতিক ঠিকানা। এই জীবনের আসল ঠিকানা সত্যিই কি আমরা জানি? নাকি জানতে পারি? এ এক আশ্চর্য প্রশ্ন। এ জীবনই একদিন চলে যায় অনন্ত জীবনের কাছে। তন্ময়তার জগত থেকে মন্ময়তার জগতে। স্থির দৃশ্যের থেকে অস্থির নির্বিকার। দৃশ্যের থেকে অনন্ত দৃশ্যহীনতায়। অসীম থেকে সসীমে। কেমন সেই ঠিকানা? 
আল্লামা ইকবাল বলেছেন, মৃত্যুর পরে চির আলোকময়। বার্গেজ বলেছেন, মৃত্যুর পরে চির অন্ধকার। সোপেনহাওয়ার বলেছেন, মৃত্যুর পর চির শুন্য। 
আসল ঠিকানা তবে কি? আলোক-আঁধার-শুন্য? 

কবি বিমল কুণ্ডুর ‘জীবন-কবিতা’ যেন জীবনের অমোঘ শ্লোক, বস্তুনিষ্ঠ জীবনের অকথিত বেদনার নিবিড় মর্মবাণীর সারাৎসার। বাকসৌন্দর্যের অনুপম শিল্পশৈলীর উদাহরণ যা এক কণা জলবিন্দুর মধ্যে অপার সমুদ্রের কলগান মূর্ছিত। কাব্য স্বভাবে জীবন ঘনিষ্ঠ রিপু সংবেদনশীল এক কবি বিমল কুণ্ডু। কবিতা তাঁর অনুধ্যান। জীবনের আর এক নাম। 

কবিতাটি তুলে ধরছিঃ

জীবন-কবিতা

তুমি কাঁদলে আমার ভাল লাগে-তাই তোমাকে কাঁদাই
তোমার আঁখিতে ব্যথার যে অশ্রু ঝরে
তাই আমার কাব্যের উৎস।

তুমি হাসলে আমার ভাল লাগে-তাই তোমাকে হাসাই
তোমার হাসিতে যে মুক্ত ঝরে
তাই দিয়ে আমি কবিতা সাজাই।

এমনি করে মাঝেমধ্যে হাসো আর কাঁদো
তা হলে আমার কবিতায় সুখ-দুঃখ দুটিই থাকবে।

হাসি আর কান্না প্রেম আর বেদনা
মিলেমিশে একসাথে জীবনের ঠিকানা।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাশিয়ার কবিতা

তোমার জন্য রজনীগন্ধা দিন

জার্মানির কবিতা